প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শুধু প্রযুক্তি থাকলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয় না। কারণ, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারলেও এর সঙ্গে মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই। আজ শনিবার রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করতে চাই, আজ ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২ এর শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আরো একটি ধাপ এগিয়েছি।

তিনি বলেন, আজ যেই হাসপাতালটির আরেকটি ভবনের উদ্বোধন হলো, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর এ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম খালেদা জিয়া। সময়ের প্রয়োজনে আরো আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে আজ এ হাসপাতাল আকার-আয়তনে আরো বড়ো রূপ ধারণ করল।

তারেক রহমান বলেন, আপনারা নিঃসন্দেহে জানেন, নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুবিক জটিলতা—যেমন স্ট্রোক, ইপিলেপসি বা খিঁচুনি, পারকিনসন্স ডিজিজ, ডিমেনশিয়া, কিংবা মেরুদণ্ডের জটিল রোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আজকের এ ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন উদ্বোধনের মাধ্যমে এ ধরণের রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত এ নতুন ভবন কেবল রোগী ভর্তির ধারণক্ষমতাই বাড়াবে না,

বরং চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্বাস করি।

শুধু প্রযুক্তি থাকলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয় না, এর সঙ্গে মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই। একথা সবাই উপলব্ধি করে, রোগীর প্রতি একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা, রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝা এবং রোগীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসার মান অনেক বাড়িয়ে দেয়। তবে একইসঙ্গে আমাদেরকে এটিও মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা সেবা এবং চিকিৎসা পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতে সব দায় দায়িত্ব চিকিৎসকের একক নয়।

তারেক রহমান বলেন, আমি মনে করি, চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন- এ তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সম্মান এবং সহানুভূতির সম্পর্ক থাকা বজায় থাকা জরুরি। এ তিনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং সম্মানের পরিবর্তে চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন কিংবা রোগী এবং রোগীর স্বজনরা যদি চিকিৎসকদের উপর বিশ্বাস এবং মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে আমরা যতই হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।

স্বাস্থ্যের অধিকার কেবল মৌলিক অধিকারই নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতিরও চাবিকাঠি বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া জরুরি। উন্নত চিকিৎসা যদি শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা বলা যায় না। সুতরাং, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগী যাতে যেকোনো চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে না হয়, এজন্য সরকার ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে একদিকে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। অপরদিকে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই

পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে এ যাবৎকালে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়ে বর্তমান সরকার প্রমাণ করেছে সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায় এটি স্রেফ একটি স্লোগান নয়। বরং সরকার দেশে একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যাতে মানুষ দেশের ভেতরেই সকল রকমের স্বাস্থ্যসেবা পায়। তবে স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে সরকার যত উদ্যোগ গ্রহণ করুক, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের ভূমিকার উপরই স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবার সাফল্য নির্ভর করবে।