১৯ বছর আগে ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর গত বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। সে হিসাবে এবার তা কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসের হারে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছরের তুলনায় ঢাকা বোর্ডে পাসের হার বেড়েছে ৪ দশমিক ১২ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষায়। এবার মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় এ হার কমেছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। গত বছর এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফলেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। যশোর শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ ও বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাস করেছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। সিলেট বোর্ডে এ হার ৫৮ দশমিক ৩৩, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক শূন্য ৫ ও ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
তবে পাসের হার কমলেও বিষয়টিকে নেতিবাচক দেখার কারণ নেই বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু শিখেছে, সেটি মূল্যায়নের যে চেষ্টা এবার করা হয়েছে, তা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের দিক থেকে ইতিবাচক। বিগত সরকারের সময়ে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, নকল ও ওভারমার্কিংয়ের মাধ্যমে ফল ভালো দেখানোর প্রবণতা ছিল। ফলে ৮০-৯০ শতাংশ পাসের হার হলেও শিক্ষার গুণগত মান সেভাবে বাড়েনি। শিক্ষার উদ্দেশ্য পাসের হার বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখেছে তা নিশ্চিত করা। এবার প্রশ্নফাঁস হয়নি, পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি ছিল এবং ওভারমার্কিংয়ের কোনো নির্দেশনাও দেয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা যতটুকু শিখেছে, তার ভিত্তিতেই মূল্যায়নের চেষ্টা হয়েছে। পাসের হার কিছুটা কমলেও এটিকে শিক্ষার মানের অবনতি বলা যাবে না; বরং ভঙ্গুর একটি ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সঠিক পথে ফিরছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তবে শিক্ষার গুণগত মান আরো বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রয়োজন নেই এমন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে একীভূত করা, শিক্ষকদের মর্যাদা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নিতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মানসিক জগতেও পরিবর্তন এসেছে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমেছে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ঐতিহ্যগত সম্পর্কও কিছুটা নষ্ট হয়েছে। শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে, যা মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ শিক্ষার্থী। সে হিসেবে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
এছাড়া গত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এবার সারা দেশে মোট ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৯৯টি প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০ বা তার কম এবং মাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০-এর বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত।
ফলাফলের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনার পর শিক্ষা ব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ওই সময় গ্রেস দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাস করানো হয়েছে। এখন যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া এবারের ফলাফলে ঢাকা বোর্ড ভালো করেছে। এর মাধ্যমে নগর, শহর ও মফস্বলের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্যও উঠে এসেছে। এটি বাস্তব চিত্রেরই প্রতিফলন।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকার সমস্যা রয়েছে। বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন, এমনকি ইসলাম শিক্ষার শিক্ষককেও ইংরেজি পড়াতে দেখা গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এভাবে কাজ চালানো গেলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে তা সম্ভব নয়। ৩১২টি বিদ্যালয়ে কেন শতভাগ ফেল করেছে, তার কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। ফেল করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও সরকার উভয়েই তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছে। তাই এমন ফল কাম্য নয়। কেন এমন হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।’
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এসএসসি-এইচএসসির মতো পরীক্ষাগুলোয় উচ্চ পাসের হার দেখা গিয়েছিল। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ছিল, নিজেদের অর্জন দেখাতেই ওই সময় প্রকৃত ফলাফল আড়াল করে অধিক নম্বর প্রদানের মাধ্যমে পাসের হার বেশি দেখানো হয়েছিল। শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরিবর্তন আনা হয়েছিল এবং নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর না দিয়ে প্রকৃত নম্বর প্রদানের। এর জেরে ২০২৫ সালের এসএসসির ফলাফলে বড় ধরনের ধস নামে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ ও ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
পরীক্ষার ফল নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেয়া যায় না। অনেক শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় ভালো করার কথা থাকলেও অনেক সময় খারাপ করে ফেলে। আগে আইন অনুযায়ী খাতা পুনর্নিরীক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। আমরা আইন সংশোধন করেছি। যে শিক্ষার্থী খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করবে, তার সম্পূর্ণ খাতা পুনঃপরীক্ষণ করা হবে এবং কোথাও কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বছর ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় গত ২১ এপ্রিল। এর মধ্যে এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। দাখিল এবং এসএসসি ও ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২৪ মে শেষ হয়। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ ও ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনালে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ পরীক্ষার্থী ছিল। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।










