দেশে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসার ও তৃণমূল পর্যায়ে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের আগামী ছয় মাসের জন্য বিশেষ কর ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য হেলেন জেরিন খানের ৭১ বিধিতে উত্থাপিত ‘জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের’ জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি আমদানিতে বর্তমানে ১ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের উৎসাহিত করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এটি সহজলভ্য করতে আগামী ছয় মাসের জন্য অতিরিক্ত অন্য সব শুল্ক ও কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত আমদানি করা এসব যন্ত্রাংশে ১ শতাংশের অতিরিক্ত সব ধরনের কাস্টমস ডিউটি (সিডি), রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি), মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আগাম কর (এটি) ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) থেকে পূর্ণ অব্যাহতি দেয়া হবে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের আগেই যারা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন এবং নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ (নেট মিটারিং) করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে আকর্ষণীয় মূল্যে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনে নেবে।
প্রতিমন্ত্রী দেশের সার্বিক জ্বালানি চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছাবে ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের রূপরেখা নেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বায়ু, বর্জ্য, জলবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও এগ্রি-ভোল্টাইকস (কৃষি জমি ও সোলার প্রজেক্টের যৌথ ব্যবহার) প্রযুক্তি থেকে আরো ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি মালিকানাধীন পতিত জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে বৃহৎ সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিবরণ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অধীনস্থ অব্যবহৃত প্রায় ৬০ হাজার একর জমির তালিকার মধ্য থেকে প্রাথমিক সমীক্ষায় প্রায় ৩০ হাজার একর জমি সৌর প্রকল্পের জন্য উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, পরিবেশ দূষণ ও খরচ কমাতে রামপালে দ্বিতীয় পর্যায়ের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা বাতিল করে সেখানে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বৃহৎ সোলার পার্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই ফেলার জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ফেনীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন ২৩টি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পটির আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে শুভ উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনায় পুরো জাতীয় সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সোলার পাওয়ারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেন ভবিষ্যতে সংসদ পরিচালনায় জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
সরকারের নীতিগত কাঠামোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি-২০২৫ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাণিজ্যিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সৌর খাতে তরুণদের নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সহজ শর্তে অর্থায়নের আলোচনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।









