ঢাকায় প্রকৃত জনসংখ্যা কত—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না থাকলে শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন। কেউ বলেন দুই কোটি, কেউ বলেন তিন কোটি। অথচ একটি শহর কত মানুষকে ধারণ করতে পারবে, সে সক্ষমতা নির্ধারণ করেই পরিকল্পনা করতে হয়। প্রতিদিন ঢাকায় মানুষ আসছে, অনেকে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতি তৈরি করছেন। ঢাকায় মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে না পারলে শুধু আইন প্রয়োগ করে বস্তি ঠেকানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঢাকার পরিকল্পনা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মডেল এখানে হুবহু প্রয়োগ করা যাবে না। আমাদের লক্ষ্য ‘স্মার্ট’ শহর নয়, বরং এমন একটি বাসযোগ্য ঢাকা, যেখানে মানুষ অন্তত ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

একটি শহরকে বাসযোগ্য করতে যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা ও গণপরিবহনসহ অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসবের সবই রাজউকের অধীনে নয়। বিভিন্ন বিষয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। রাজউকের মূল কাজ পরিকল্পনা প্রণয়ন, ড্যাপ তৈরি ও নকশা অনুমোদন। ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর হবে না।

কাগজে-কলমে ড্যাপ ভালো পরিকল্পনা হলেও বাস্তবে তার সঙ্গে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয়ের জায়গায়ও অননুমোদিত ১০ তলা ভবন গড়ে উঠেছে। ফলে পরিস্থিতি অনেকটা ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’-এর মতো।

টোকিওর অভিজ্ঞতা থেকেও আমাদের শেখার আছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করে। আমাদের সমস্যা হলো আমরা পরিকল্পনা করি পাঁচ বছরের জন্য, কিন্তু বাস্তবায়নে ২৫-৩০ বছর লেগে যায়। গাবতলী ও উত্তরায় ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট বা টিওডি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এ ব্যবধান কমাতে হবে।

আইন না মানার প্রবণতাও বড় সমস্যা। ভবনের নকশার বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক শিক্ষিত, মেধাবী ও বিত্তবান ব্যক্তিও তাদের ভবনের অনিয়মে ছাড় দেয়ার অনুরোধ করেন। অথচ আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

রাজউকের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে। পিয়ন-দারোয়ানসহ রাজউকের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১২০০ জন; পরিদর্শক মাত্র ১০০ জনের মতো। এটা দিয়ে কীভাবে এত হাজার হাজার বাড়ি মনিটরিং করা সম্ভব? পৃথিবীর কোথাও কি পুলিশিং করে বাড়িঘর নির্মাণ তদারকি করা হয়?

রাজউক প্ল্যান তৈরি করে না, নকশা অনুমোদন দেয়। আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্ল্যান করিয়ে জমা দেয়া হয় এবং অঙ্গীকার করে যে নকশা অনুযায়ী বাড়ি করবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি মালিক কিংবা ডেভেলপার ভাইয়েরা তা মানেন না।

আমরা গ্রিন বিল্ডিংয়ের জন্য দশমিক ৫ শতাংশ ছাড় দিচ্ছি। অন্তর্ভুক্তিমূলক হাউজিংয়ের জন্য তিন কাঠা জমির ক্ষেত্রে ১০০০ বর্গফুট, পাঁচ কাঠায় ২৮০০ বর্গফুট ও ১০ কাঠা জমির জন্য ৩৬০০ বর্গফুট অতিরিক্ত স্কয়ার ফিট ইনসেনটিভ দেয়া হচ্ছে, যদি বিল্ডিংটি গ্রিন হয়। এছাড়া সোলার সিস্টেম স্থাপন করা এখন নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক বিঘা জমিতে ১০ শতাংশ বৃক্ষরোপণও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি ভবনে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ভবনের নিরাপত্তায় ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের সুযোগ বাড়াতে এমআইএসটিতেও এ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এখন আর্কিটেক্ট ও ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারদের নকশা অনুযায়ী নির্মাণের প্রত্যয়ন দিতে হবে। এরপর রাজউক পরিদর্শন করে অকুপেন্সি দেবে। এর মাধ্যমে অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে।