সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম দোহাজারী-গুনদুম রেলওয়ে প্রকল্প। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৪৭ শতাংশ। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি ও বর্ষা মৌসুমের কারণে টানা কয়েক মাস বন্ধ থাকলেও শীত মৌসুমে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার (সরাসরি ও সাব-কন্ট্রাক্টরসহ) শ্রমিক ও কর্মী কাজ করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানো এবং কাজে গতি ফেরাতে এসব কর্মীকে ক্যাম্প পদ্ধতিতে প্রকল্প এলাকায় রাখা হচ্ছে।
একই চিত্র চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুতল সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পেও। এ প্রকল্পে ছয় শতাধিক বিদেশী (চীনা) শ্রমিক ছাড়াও সর্বমোট প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মী নিয়োজিত রয়েছে। শ্রমিক সংগ্রহের ক্ষেত্রে শীত মৌসুমে বাড়ি ফিরতে পারবে না এমন শর্ত দিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রকল্প এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প ছাড়াও প্রকল্পের অধীনে নির্মাণ হওয়া ডরমিটরিতে থাকছেন শত শত কর্মী। নদী তীরবর্তী উভয় পাশেই নির্মাণ হওয়া ক্যাম্প ছাড়া শ্রমিকরা পূর্ব অনুমতি না নিয়ে কোথাও বের হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।
২০২০ সালের মার্চ থেকে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি ও সাধারণ ছুটিতে দেশের অধিকাংশ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজ স্তিমিত ছিল। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে কার্যক্রম শুরু হয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বিলম্বিত টানা বৃষ্টিপাতের কারণে বছরের শেষার্ধেও কাজের অগ্রগতি তেমন একটা বাড়েনি। শীত মৌসুমে পুরোদমে কাজ শুরু হলেও বেড়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি। এ অবস্থায় ঝুঁকি এড়িয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে ক্যাম্প পদ্ধতিতে শ্রমিকদের একটানা রেখে কাজ চালু রেখেছে মেগা প্রকল্পগুলো।
জানতে চাইলে দোহাজারী-গুনদুম রেলওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ২০২০ সালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। এরপর কাজ শুরু হলেও বর্ষা মৌসুমের কারণে কাজের অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পিছিয়ে পড়েছে। শীত মৌসুমে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকি এড়িয়ে দ্রুত প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকার শ্রমঘন অংশে ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে শ্রমিকদের। প্রকল্পের বিদেশী কর্মীরাও এভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
জানা গেছে, দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি কর্মযজ্ঞ চলছে কক্সবাজার এলাকায়। সেখানকার রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণে দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিদেশী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কক্সবাজার এলাকায় এসব শ্রমিককে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব শ্রেণীর কর্মীদেরও প্রকল্পের কাজ ছাড়া বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অস্থায়ী এসব ক্যাম্পে মেস পদ্ধতিতে খাবার তৈরিসহ নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কোনো শ্রমিককে নিজ বাসস্থানে ফিরতে দেয়া হচ্ছে না। এতে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মীদের মধ্যে করোনাভাইরাসের ঝুঁকিও কমেছে বলে মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
এ প্রকল্পের হারবাং, নাপিতখালি এলাকায় রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ ও বড় সেতু নির্মাণের প্রয়োজনে প্রতিটিতে শতাধিক শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। এসব শ্রমিককে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১৩০ জন বিদেশী কর্মী নিয়োজিত থাকলেও শুধু নাপিতখালি ক্যাম্পেই ৮০-৯০ জন চীনা শ্রমিক কাজ করছেন। প্রকল্পের কাজবহির্ভূত অন্য কোনো প্রয়োজনে এসব শ্রমিক ক্যাম্প এলাকার বাইরে বের হচ্ছেন না বলে নিশ্চিত করেছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
এদিকে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে তিন মাসে (এপ্রিল-জুন পর্যন্ত) ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ, যা প্রকল্পের গতি অনেকটা পিছিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে যেসব চীনা শ্রমিক ছুটিতে নিজ দেশে গিয়েছিলেন, তারাও ফেরত আসতে পারেননি দীর্ঘদিন। এ অবস্থায় প্রকল্পের কাজের গতি বাড়াতে আরো ৮৮ জন চীনা শ্রমিক নতুন করে যুক্ত করে বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ ১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬১ শতাংশ। যদিও একই সময়ে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। টানেলের একটি টিউবের খননকাজ এরই মধ্যে শেষ হওয়ার পর ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে দ্বিতীয় টিউবের খননকাজ শুরু করেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যেকোনো নদীর তলদেশে টানেলের বোরিং কাজ শুরু হলে প্রথমদিকের খননকাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বোরিংয়ের এক-তৃতীয়াংশ শেষ না হলে এ ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে এ সময়ে শ্রমিক সংকট কিংবা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে শ্রমিকের প্রকল্প এলাকার বাইরে চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এজন্য শর্তসাপেক্ষে শ্রমিক নিয়োগও দিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। মূলত শীত মৌসুম পর্যন্ত আগামী কয়েক মাস মেগা প্রকল্পটির কাজ করতে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, টানেলের দ্বিতীয় টিউবের খননকাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের উভয় পাশেই থাকার ব্যবস্থা করেছে। প্রকল্প এলাকায় এখন বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আবার প্রকল্পের শ্রমিকরাও প্রকল্প এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই। শীত মৌসুমে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানো ছাড়াও দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ এগিয়ে নিতে প্রকল্পের বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের রেখে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।









