তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ নির্বাচিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের রয়েছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা। তার মতে, সরকারের ১৮০ দিনের বড় সাফল্য হচ্ছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন।
তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ‘শাপলা’য় গতকাল দুপুরে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র এসব মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর সঞ্চালনায় সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বক্তব্য দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘সরকারের এ ছয় মাসে সবচেয়ে ডিফারেন্ট ও চোখে লাগার মতো বিষয় হচ্ছে নির্বাচনী ইশতাহারকে ধারণ করে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অবিরত কাজ চালিয়ে যাওয়া। আমরা দেখেছি গত ছয় মাসে সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কীভাবে সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমে অনুমোদিত হয়েছে।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইন অনুশাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করতে দেখেছি, যেখানে একবারের জন্যও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন হয়নি। আমরা দেখেছি সর্বোচ্চ বাকস্বাধীনতার চর্চা, অনেক সময় সেটি সীমাও লঙ্ঘন করেছে। উসকানি দেয়া হয়েছে, আবার অশোভন আচরণ করা হয়েছে। তার পরও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে সেটিকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান জনগণের সরকার।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব নেয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং সম্পূর্ণ নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে যে শিক্ষার্থীর যে গ্রেড বা নম্বর প্রাপ্য, ঠিক সেভাবেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ফ্যাসিবাদের সরকার লোপাট করে দিয়েছিল। এর ফলে ২০২২ সালের পর থেকে চার বছর ধরে সম্মানিত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাদের অবসর ও কল্যাণের ন্যায্য টাকা পাননি। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে অর্থের সংস্থান করে দেন। প্রাথমিকভাবে ২ হাজার কোটি টাকার চেক প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তুলে দেয়া হয়েছে।’
শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যক্রমে চতুর্থ শ্রেণীতে দুটি ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে দুটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মাহদী আমিন বলেন, ‘বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা, প্রথম শ্রেণী থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ প্রদান শুরু হয়েছে। এছাড়া প্রাইমারি গোল্ডকাপে ছেলে-মেয়েসহ মোট ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে দেশজুড়ে একটি অভূতপূর্ব ক্রীড়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ‘ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং কম্পিটিশন’ আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে মিড-ডে মিল কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে চালু হয়েছে। তৃতীয় ভাষাশিক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এবং তৃতীয় ভাষায় দক্ষ বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে বাইরে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধার জন্য যে নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন করা হচ্ছে, তা অনেকটাই চূড়ান্তের পথে রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে শহীদ হওয়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকারি সহায়তার হাত প্রসারিত করা হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের দেশে ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী আরো বাড়ানো হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে আলাদা তহবিলের ব্যবস্থা ও শ্রমবান্ধব আইনের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও জানান উপদেষ্টা।
পাশাপাশি ট্রেড ও ব্যবসার লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজতর করা হয়েছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে উৎপাদনমুখী উদ্যোগ বহুমুখী রূপ নিয়েছে। ব্যবসা সহজ করা এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সরকার মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বাধা দূর করে সুযোগ আরো বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পলিসি সাপোর্ট ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় সাধন করেছে। মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিদেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছিল, তা দেশে ফেরত আনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশ, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সাধারণ মানুষ পূর্ণ আস্থা ফিরে পাচ্ছে, মানুষ কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তাৎক্ষণিক সমাধান ও আইনি প্রতিকার পাচ্ছে। এর পরও বিভিন্ন অপশক্তির ষড়যন্ত্র এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সজাগ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন করতে চাই, সেই সংস্কার কমিশনকে যারা সহায়তা করবে, তাদের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থাকে, তা দূর না করে কমিশন গঠন করলে ভালো কাজ হবে না। এ কারণে একটু সময় লাগছে, তবে শিগগিরই হবে।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ বলেন, ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন করার জন্য নির্বাচনী ইশতাহারে যে কথা বলা আছে সরকার সে পয়েন্ট থেকে সরে আসেনি। বরং সে লক্ষ্যেই কাজ করছে এবং ইন দ্য মিন টাইম কিছু প্রক্রিয়াও আপনারা দেখেছেন, কিছু কিছু কাজ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু হয়েছে।’ বিশেষ করে আগের সরকারের অনুগত কিছু ব্যক্তি এখনো প্রশাসনে রয়ে গেছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘তাদের সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে চিহ্নিত করে সেসব জায়গা পরিষ্কার করার একটি চেষ্টা আমরা করেছি এবং তা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।’
গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কাজ চলছে উল্লেখ করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণমাধ্যমের যারা কথা বলেছেন, তারা সবাই আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। তারা বলেছেন, এই প্রথম তারা কোনো গণমাধ্যমে কোনো ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব অনুভব করেননি। এ কারণে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠনে তাদের আগ্রহ এবং আমাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনো অমিল নেই।’
রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার তোষামোদ ও বন্দনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছে। অতীতে মঞ্চে উঠে দীর্ঘ সময় বন্দনা করার যে প্রথা ছিল, তা থেকে সরকার সরে এসেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক যেসব বিষয় দীর্ঘদিন চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেগুলো থেকেও বেরিয়ে আসা গেছে।’ জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতেই এ ১৮০ দিনের পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতাহারের প্রতিটি দফা ধরে ধরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অতীতে নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি এভাবে ধরে ধরে বাস্তবায়নের নজির দেখা যায়নি।’
রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনাকে সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতীতে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার দায় সরাসরি সরকারের না থাকলেও জবাবদিহির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে শোকাহত পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।’
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হলো। বিগত সরকার যে জঞ্জাল ও ভঙ্গুর অবস্থায় দেশকে রেখে গিয়েছিল, সেই পরিস্থিতির মধ্যেও বর্তমান সরকার যে স্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারছে, এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক এসএম আব্দুল আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।










