প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, প্রবাসীরা আমাদের গর্ব এবং অর্থনীতির একটি বিশাল শক্তি। সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কটা শুধু দ্বিপক্ষীয় বা ব্যবসায়িক নয়, বরং দুদেশের মধ্যে একটা মানবিক সম্পর্কও রয়েছে।

বৈধ ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বীকৃতি দিতে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ রেমিট্যান্স সম্মাননা ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। আজ সোমবার স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা) সিঙ্গাপুরের ৩০ র‍্যাফেল অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত সিঙ্গাপুর ফ্লায়ায়ের প্লুম ভেন্যুতে এ সম্মেলন আয়োজিত হয়।

এ সময় প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা (প্রবাসী) দেশের বাইরে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। আপনাদের কাছে আমি পাঁচটি অনুরোধ রাখতে চাই। প্রথমত, সবসময় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাবেন। হুন্ডি থেকে বিরত থাকতে হবে। বৈধ পথে পাঠানো প্রতিটি মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করে। দুই, সিঙ্গাপুরের আইন, বিধিবিধান ও কর্মসংস্কৃতিকে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে হবে। কোনো ধরনের অপরাধ বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ বা অন্য যেকোনো আইনবিরোধী কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।

তিন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে। উগ্রবাদ, সহিংসতা, ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষমূলক এমন কোন পোস্ট মন্তব্য বা প্রচারণার সঙ্গে নিজেকে কখনোই সম্পৃক্ত করা ঠিক হবে না। চার, ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি আপনাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর পাঁচ, নিজেকে প্রতিনিয়ত দক্ষ করে তুলতে হবে। নতুন প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে নিজেদের আরো এগিয়ে নিতে হবে।

তিনি জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আপনাদের পাশে আছে। আপনাদের এ কাজে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আপনাদের হাই কমিশনের দরজা সবসময় খোলা। আপনারা সবসময় হাইপ্রেফারেন্স পাবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীদের কল্যাণ, নিরাপদ অভিবাসন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রী বহুমুখী প্রবাসী ও অভিবাসনবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছেন। সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশে নতুন ইনভেস্টমেন্ট আনার কাজ, অপরদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও কাজ শুরু হয়েছে। তার নেতৃত্বে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন, প্রবাসী কার্ড প্রবর্তন, বিদেশে বিপদগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তা এবং প্রবাসী সেবা সহজীকরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় সরকার দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশীদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশী সিঙ্গাপুরে কর্মরত আছেন। আপনারা নির্মাণ, মেরিন, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। আপনারা বাংলাদেশের উন্নয়নের নির্মাতা। আপনাদের কঠোর পরিশ্রম যেমন আপনাদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে আরো সুদৃঢ় করে। দেশের উন্নয়ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন পূরণের সঙ্গে আপনাদের অবদান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকেই প্রায় ৪৭৫ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। দেশের রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে বর্তমানে সিঙ্গাপুরের অবস্থান দশম। এ রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি অসংখ্য পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার এ অবদানকে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখে।

তিনি বলেন, আজ যাদের সম্মাননা দেয়া হচ্ছে তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। তবে আজ হয়তো এ মঞ্চে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী সম্মাননা পাচ্ছেন। কিন্তু আমার কাছে সিঙ্গাপুরে কর্মরত প্রত্যেক সৎ, পারিশ্রমিক, দায়িত্বশীল এবং আইন মেনে চলা বাংলাদেশী একটা সম্মানিত রেমিটেন্স যোদ্ধা। আপনারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের গর্ব এবং উন্নয়নের অংশীদার।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাবেন না। তারা বিনিয়োগ করবেন, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে ভাববেন, উদ্যোক্তা হবেন এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের পাটজাত কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, ওষুধ ও অন্যান্য মানসম্পন্ন পণ্যের জন্য সিঙ্গাপুরের নতুন বাজার তৈরিতে প্রবাসী বাংলাদেশীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আপনারা দুদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারেন। দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে আপনাদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার এ উদ্যোগ নেয়ায় বণিক বার্তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এ গৌরবময় আয়োজনে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছি। এ সম্মাননা দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন হলেও আমি মনে করি এটি একটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ।