চলতি বছরের ১৭ মার্চ পূর্বাঞ্চলের গুণবতী-হাসানপুর সেকশনে বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন এবং ১৯ মে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ওই সময়ে লাইন ক্লিয়ার না হওয়ায় শিডিউল বিপর্যয় ছাড়াও রেলের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়। ট্রেন বাতিল ও বিলম্বের ঘটনায় ১৯ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৩ টাকার টিকিট রিফান্ড হয়েছে, যা দুর্ঘটনায় ভৌত-অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি রাজস্ব আয়ে বড় লোকসান বলে মনে করছে রেলওয়ে।
এ-সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের আন্তঃনগর ট্রেন নম্বর ৭০৩/৭৪২ (গোধূলী ও তূর্ণা), ৭৮৫ নম্বর বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন (হাসানপুর-জামালপুর) ও ৭৮৬ নম্বর বিজয় এক্সপ্রেস (জামালপুর-চট্টগ্রাম) ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছিল। বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত কমিউটার ট্রেনগুলোর মধ্যে ১৭ মার্চ ৪ নম্বর কর্ণফুলী কমিউটার ও ৩০ নম্বর সাগরিকা কমিউটার ট্রেন (লাকসাম-চট্টগ্রাম), ১৮ মার্চ ৩ নম্বর কর্ণফুলী কমিউটার (ফাজিলপুর-ঢাকা), ২৯ নম্বর সাগরিকা কমিউটার (চট্টগ্রাম-চাঁদপুর) ও ৩০ নম্বর সাগরিকা কমিউটার (চাঁদপুর-চট্টগ্রাম) এবং ১৯ মার্চ ৪ নম্বর কর্ণফুলী কমিউটার লাকসাম-চট্টগ্রাম সেকশনে যাত্রা বাতিল করা হয়। এছাড়া ১ নম্বর আপ (চট্টগ্রাম মেইল), ২ নম্বর ডাউন (ঢাকা মেইল), ৮১৩ ও ৮১৪ নম্বর কক্সবাজার এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের ৭২০ নম্বর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, ৩৭/৩৮ নম্বর ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস, ৭২৯ নম্বর মেঘনা এক্সপ্রেস (চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম), চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ৮০২ নম্বর চট্টলা, ৭০২ নম্বর সুবর্ণ, ৭৮৭ নম্বর সোনার বাংলা এবং ৭৪১ নম্বর তুর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেন বিলম্বে চলাচল করেছে।
৭৮৫ নম্বর ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে যাত্রা বাতিল ও বিলম্বের কারণে ১৭ ও ১৮ মার্চ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্টেশনে ১৮ লাখ ১২ হাজার ৬৩৮ টাকার বিক্রি হওয়া টিকিট রিফান্ড করেছেন যাত্রীরা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ফেনী, লাকসাম, কুমিল্লা ও কসবা স্টেশন টিকিট ফেরত দিয়েছে ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৭৬৫ টাকার। অন্যদিকে ঢাকার কমলাপুর, বিমানবন্দর, আখাউড়া, ভৈরববাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর টাউন, সরারচর, কিশোরগঞ্জ, গৌরিপুর, ময়মনসিংহ স্টেশনে রিফান্ড হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৮৫ টাকা এবং চট্টগ্রাম, ফেনী, লাকসাম, কুমিল্লা ও কসবা স্টেশনে টিকিট রিফান্ড হয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৮৯ টাকার। এছাড়া বেসরকারি খাতে পরিচালিত ট্রেনগুলোর আর্থিক লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯৯ টাকা। সব মিলিয়ে ১৭ ও ১৮ মার্চ রিফান্ড-লোকসানের পরিমাণ ১৮ লাখ ১২ হাজার ৬৩৮ টাকা।
এদিকে ১৯ মার্চ পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বিক্রীত টিকিট ফেরত এসেছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪০৫ টাকার এবং বিমানবন্দর স্টেশনে টিকিট ফেরত এসেছে ১১ হাজার ৪১০ টাকার। সব মিলিয়ে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনে দুর্ঘটনায় রেলের টিকিট ফেরত এসেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮১৫ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্রেনে দুর্ঘটনা কিংবা শিডিউল বিপর্যয় হলে যাত্রীদের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বিশেষ রিফান্ড সুবিধা দেয়া হয়। বিজয় এক্সপ্রেস ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার কারণে কয়েক দিন রেলের শিডিউলে কিছুটা অসংগতি ছিল। যার কারণে রিফান্ডের পরিমাণ কিছুটা বেশি হয়েছে।’ এ ধরনের রিফান্ড নিয়মিত ঘটনা হওয়ায় রেলের মূল রাজস্ব আয়ে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন তিনি।
তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, টিকিট রিফান্ড ছাড়াও ট্রেন বাতিল, শিডিউল বিপর্যয়ের মধ্যেও চলাচল করা ট্রেনের যাত্রী কম হওয়ায় রেলের রাজস্ব আয় এমনিতে কমেছে। রিফান্ডসহ ট্রেনের টিকিট বিক্রি কমে যাওয়ায় সব মিলিয়ে দুটি দুর্ঘটনায় রেলের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা। চলতি বছরের প্রথম মাস থেকে রেলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে বারবার শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। যার কারণে শিডিউল ট্রেন চলাচল বাতিলসহ টিকিট রিফান্ডের হার বেড়ে যাওয়ায় রেলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খাতে আয় কমছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্যিক বিভাগ।
প্রসঙ্গত, ১৭ মার্চ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার হাসানপুর রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে তেজেরবাজার এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। দুইদিন পর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়লে ট্রেন চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ে রেলওয়ে।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে সময়মতো ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করতে না পারলে যাত্রীরা টিকিট ফেরত নিতে পারে। হাসানপুরে দুর্ঘটনার সময় বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল ও বিলম্বে ছেড়ে যায়। এজন্য একসঙ্গে অনেক যাত্রী টিকিট রিফান্ড করেছে।’ সাময়িকভাবে রাজস্ব আয় কম হলেও যাত্রীদের প্রতি রেলের দায়বদ্ধতা ও সেবা হিসেবে এটা প্রকৃত লোকসান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।










