ঘূর্ণিঝড় মিধিলার প্রভাবে বাগেরহাটে টানা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর ধানের বীজতলা। মাঠঘাট ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি চলে গিয়েছে পানির নিচে। যার ফলে চারা দেয়া ক্ষেতের ধান ভেসে যাওয়া ও নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া চারা দেয়ার জন্য বীজ ধান প্রস্তুত থাকলেও, পানি ও বৃষ্টির কারণে বীজতলায় রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে আজ শুক্রবার (১৭ নভেম্বর) বিকেল পর্যন্ত অব্যাহত ভারী বর্ষণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ধানের চারা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন চাষিরা। যার প্রভাব পড়তে পারে বোরো উৎপাদনে। 

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বাগেরহাটে ৬৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো রোপণ করবেন কৃষকরা। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ লক্ষ ৩০ হাজার মেট্রিক টনের কাছাকাছি।

বাগেরহাটে মূলত নভেম্বরের শুরু থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বোরো মৌসুম চলে। বোরো রোপণের জন্য চাষিরা নভেম্বরের শুরু থেকে চারা তৈরির জন্য ক্ষেতে বীজ ধান বোনা শুরু করেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাগেরহাট সদর উপজেলা, কচুয়া, ফকিরহাট, চিতলমারী, মোল্লাহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমিতে চাষিরা বীজ ধান ফেলেছেন। জমিতে ফেলা বীজ ধান বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে। বীজ ধান ফেলার জন্য প্রস্তুত করা জমির ওপর এক থেকে ২ ফুট পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে। এই বৃষ্টি যদি স্থায়ী হয় তাহলে অনেক বেশি ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন কৃষকরা।

কচুয়া উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক শেখ রুস্তম আলী বলেন, ১৮ কেজি বীজ ধান প্রস্তুত করেছিলাম চারা দেয়ার জন্য। যে জমিতে বীজ বুনব সেখানে এখন প্রায় ২ ফুট পানি। শনিবারের মধ্যে পানি না কমলে, আমার ৬ হাজার টাকার ধান পানিতে ফেলে দিতে হতে পারে।

পাশ্ববর্তী গ্রাম পদ্মনগরের শহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার বীজ ফেলেছিলাম, চারা মাত্র বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এখন চারার ওপরে দেড় ফুট পানি। কী হবে জানি না।

শুধু রুস্তম-শহিদুল নয়, কয়েক হাজার চাষির অবস্থা একই রকম। তবে বৃষ্টিতে ঘেরের পাড়ের সবজি ও শীতকালীন সবজিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে বেশকিছু এলাকায় ঝড়ে পেঁপে ও কলা গাছ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বৃষ্টি স্থায়ী হলে সবজি চাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।

অন্যদিকে শঙ্কায় রয়েছেন আমন চাষিরাও। বেশকিছু এলাকায় আধাপাকা আমন ধান নুয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে আমন ধান। ঝড় ও বৃষ্টির স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি পেলে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা তাদের।

শরণখোলা উপজেলার খুড়িয়াখালী আমন চাষি রেজাউল গাজী বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কেটে ঘরে তোলার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু রাতভর বৃষ্টিতে ধান একদম নুয়ে পড়েছে।

আমন চাষি হারুন শেখ বলেন, কয়েকদিন হয়েছে ধান ফুলে বের হয়েছে। এখন পর্যন্ত ধান দাঁড়ানো রয়েছে। তবে বৃষ্টি বেশি হলে ধান ঘরে তোলা যাবে না।

মোল্লাহাট উপজেলার গাড়ফা গ্রামের কৃষক প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ঝড়ে আমার ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। একশর বেশি পেঁপে গাছ ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি গাছে ১ থেকে দেড় মণ পেঁপে ছিল। কৃষকদের শস্য বিমার আওতায় ‌আনার দাবি জানান তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাগেরহাটের উপ-পরিচালক শঙ্কর কুমার মজুমদার বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বোরো ধানের বীজতলা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এখনও সময় রয়েছে, কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। ঝড়ো বাতাস বৃদ্ধি পেলে আমন ধানের কিছুটা সমস্যা হতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা। অবশ্য ঘেরের পাড়ের সবজি ও শীতকালীন সবজিতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন তিনি।