রাজধানীর হাতিরঝিল হয়ে পাশের মধুবাগের সড়কে ঢুকতেই কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে রাস্তার মাঝখানে খোঁড়া গভীর গর্ত (শাফট)। চারপাশে টিনের বেড়া। ঢাকা ওয়াসার চলমান উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে প্রায় ১০০ মিটার পরপর এমন গর্ত খোঁড়া হয়েছে। মধুবাগ থেকে পশ্চিম হাজীপাড়া, মীরবাগ ও নতুন রাস্তা হয়ে কাজের বিস্তৃতি গিয়ে ঠেকেছে ডিআইটি রোডে।

গর্তগুলো ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (ডিএসআইপি)’ অংশ। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে, শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) ঋণে চলা প্রকল্পে দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে ধাপে ধাপে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক কাটা হবে। ওয়াসা সূত্র জানায়, দুই সিটি করপোরেশনের অন্তত আরো ৫০টি এলাকায় কাজ শুরু হবে।

গর্তের কারণে সড়কটির স্বাভাবিক যান চলাচল কার্যত বন্ধ। রাস্তার বড় অংশ টিনের বেড়ায় ঘেরা থাকায় সামান্য ফাঁকা জায়গা দিয়ে কোনো রকমে রিকশা চলছে। একই পথে চলছেন পথচারীরাও। এবড়োখেবড়ো ও ভাঙা সড়কে বিপরীতমুখী যানবাহন আটকে প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে। মোটরসাইকেল আরোহীদের কেউ কেউ ভারসাম্য হারাচ্ছেন। ম্যানহোল ও ভাঙা ঢালাইয়ের উঁচু-নিচু অংশে ব্যক্তিগত গাড়ি আটকে গেলে স্থানীয়দের ধাক্কায় তা সরাতে হচ্ছে।

সরজমিনে পশ্চিম হাজীপাড়া, মীরবাগ, নতুন রাস্তা ও মধুবাগের বিভিন্ন সড়ক ও গলিতে দেখা যায়, উন্নয়নকাজে কোথাও সড়ক কাটা, কোথাও মাটি ও নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। কোথাও ডিএনসিসির ড্রেনেজকাজে ম্যানহোল বসানোর পর দীর্ঘদিনেও সড়ক সংস্কার হয়নি। আবার কিছু গলিতে আরসিসি ঢালাই কেটে মাটি খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। একটি গলিতে খননযন্ত্রও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ফলে এমনিতেই সরু গলিগুলো আরো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সড়ক কেটে ফেলে রাখার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট। বিভিন্ন বাড়ির সামনে ও বিদ্যুতের খুঁটির পাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও লেপ, কাঁথা, তোশকসহ পরিত্যক্ত জিনিস, আবার কোথাও সিমেন্টের বস্তা ও নির্মাণবর্জ্য স্তূপ হয়ে আছে।

উন্নয়নকাজের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা ও পণ্য পরিবহনেও। রিকশা-ভ্যান ও ছোট যানবাহন গলিতে ঢুকতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে গলির মুখে মালামাল নামিয়ে হাতে বা কাঁধে করে ভেতরে নিতে হচ্ছে। এতে বাড়তি শ্রম ও খরচ হচ্ছে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের।

নিরাপত্তার জন্য গর্তের চারপাশে টিনের বেড়া দেয়া হলেও ওপর থেকে খোলা থাকায় বৃষ্টির পানি জমছে। দীর্ঘদিন জমে থাকা পানিতে কয়েকটি গর্তে মশার লার্ভাও দেখা গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়নকাজের প্রয়োজনীয়তা তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা আটকে রাখা ও ধীরগতিতে কাজ চলায় দুর্ভোগ বাড়ছে। তাদের দাবি, দ্রুত কাজ শেষ করে সড়কগুলো চলাচলের উপযোগী করা হোক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর), অতিরিক্ত দায়িত্ব নুরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কাজটা জুন বা সর্বোচ্চ জুলাইয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমরা পাইপলাইন করে কিছু সলিং ও ম্যাকাডাম করার পরই ওয়াসা আবার কাটা শুরু করে। আমরা কাজটা বন্ধ রাখছিলাম, কারণ আমরা যদি ঢালাই করি আর পরে ওয়াসা আবার কাটে, তবে সরকারের ডাবল টাকা খরচ হবে। এজন্য অফিশিয়ালি মিটিংয়ের মাধ্যমে ওদের কাজ শেষ করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এখন আমাদের কাজ আবার শুরু হয়েছে। প্রায় আট-নয়টা লেন বা বাইলেনের কাজ আছে। অলরেডি একটা লেনের ঢালাই হয়ে যাচ্ছে, বাকিগুলোর ঢালাইও শিগগিরই হয়ে যাবে।’ বর্জ্য অপসারণ ও ভোগান্তি নিরসনে ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব চেষ্টা করছি, যেন ১৫-৩০ দিনের মধ্যে সাইটটা আমরা ক্লিয়ার করে বের হয়ে যেতে পারি।’

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ডিএসআইপির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব কাজটা শেষ করার জন্য। আসলে এ কাজটা ভিন্ন ধরনের। আপনারা দেখেছেন যে অনেক গভীরে কাজ করা লাগছে। জনভোগান্তির কথা চিন্তা করেই আমরা ওপেন ট্যানেলে না করে মাইক্রো ট্যানেলে কাজ করছি যাতে পুরো রাস্তা কাটা না লাগে। এ এলাকায় আমাদের চুক্তির সময় আছে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত। আশা করছি, শেষ করতে পারব। বৃষ্টিতে যাতে পানি জমে না থাকে—এ ব্যাপারে খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেব।’

এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে যেকোনো কনস্ট্রাকশনের কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার (টাইম লিমিট) মধ্যে শেষ করার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে আমরা ভোগান্তি কমাতে পারি। কিন্তু সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলো বিষয়টিকে কোনোভাবেই ধর্তব্যের মধ্যে আনে না।’ তিনি বলেন, ‘জনভোগান্তির যে একটি অর্থনৈতিক মূল্য (ইকোনমিক কস্টিং) আছে এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে—সেটি বিবেচনা না করায় তারা সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন কাজ ঝুলিয়ে রাখছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। নাগরিকদের প্রতি সেবা সংস্থাগুলোর যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা ছিল, জবাবদিহিতা না থাকায় তা এখন এক ধরনের কালচারে পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌অবিলম্বে এ জায়গাগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। একই সঙ্গে, প্রকল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত আছে তাদেরকে বিভাগীয় পন্থায় জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’