এসব প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে প্রতি বছর জনগণের করের অর্থ ব্যয় হলেও কার্যত কোনো রিটার্ন আসছে না। উল্টো প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দায় আরো বাড়ছে। অর্থ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মোট দায় ৮ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত এসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দরকার হলে বেসরকারীকরণ এবং বন্ধ করে দেয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ঋণ, প্রচ্ছন্ন দায় ও আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণসংক্রান্ত অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, যা এসব প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের প্রায় ৪৯ শতাংশ। একই সঙ্গে ৪৯টি প্রতিষ্ঠান উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দায় মোট দায়ের প্রায় ৬২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ ও দায়, মুনাফা, তারল্য, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, প্রচ্ছন্ন দায়, সরকারি ভর্তুকি ও অনুদান এবং নিরীক্ষা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১২২টি প্রতিষ্ঠানের ১৯টি অতি উচ্চ ঝুঁকির, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকির, ৫০টিকে মাঝারি ঝুঁকির, ১৮টি নিম্ন ঝুঁকির এবং পাঁচটি অতি নিম্ন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশই উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

নির্দিষ্ট সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আ‌র্থিক প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ দায়ের তথ্য অর্থ বিভাগের এ প্রতিবেদনে উঠে আসেনি। তাছাড়া সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আ‌র্থিক প্রতিবেদন প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তৈ‌রি করেনি। সর্বশেষ এ দুই অর্থবছরের দায়ের হিসাব যোগ করা হলে সে‌টি ৯ লাখ কো‌টি টাকা ছা‌ড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সং‌শ্লিষ্টরা।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে, অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, ছাতক সিমেন্ট, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ইস্টার্ন টিউবস, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল), টেলিটক বাংলাদেশ এবং একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল।

অতি উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দায় বিপিডিবির, ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এরপর জিটিসিএলের দায় ১৪ হাজার ১৩১ কোটি টাকা এবং ডেসকোর প্রায় ৬১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অতি উচ্চ ঝুঁকির প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই নিট লোকসানে রয়েছে। জিটিসিএল ছাড়া এ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ একই সঙ্গে নিট আয়, পরিচালন আয় ও পরিচালন নগদ প্রবাহে ঘাটতির মুখে রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। যেমন ভর্তুকি, অনুদান, পুনঃমূলধনীকরণ, ঋণ পুনর্গঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায় সরকারকে গ্রহণ করতে হতে পারে।

অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকির ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, বাংলাদেশ ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, তিতাস গ্যাস, জালালাবাদ গ্যাস, শাহজালাল সার কারখানা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ঋণ। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ-ইকুইটি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৩। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে প্রতি ১ টাকা ইকুইটির বিপরীতে ২ টাকা ২৩ পয়সা ঋণ নিয়েছে। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও ঋণের অনুপাত দশমিক ৬৯ এবং ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিচালন নগদ প্রবাহ আসছে না। স্বল্পমেয়াদি দায় পরিশোধে প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সক্ষমতা থাকলেও পরিচালন ব্যয়ের পুরোটা নিজস্ব আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর মুনাফা করার সক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর সার্বিক আর্থিক ঝুঁকির স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৩, যা উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণীতে পড়ে।

প্রচ্ছন্ন দায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি বড় ঝুঁকি। ২০২৪ সালের জুন শেষে ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৭টিরই প্রচ্ছন্ন দায় রয়েছে। এর পরিমাণ ৩৪ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা আইনি বা বিধিবদ্ধ দায়। এছাড়া বিচারাধীন মামলাজনিত প্রচ্ছন্ন দায় ১৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। জিডিপির তুলনায় প্রচ্ছন্ন দায় তুলনামূলক কম হলেও এসব দায় বাস্তবে পরিণত হলে ভবিষ্যতে সরকারের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

ঋণের পাশাপাশি প্রতি বছরই এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সরকার বড় আকারের ভর্তুকি দিচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিপিডিবি একাই পেয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা, যা মোট ভর্তুকির প্রায় ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর পেট্রোবাংলাকে দেয়া হয়েছে ৬ হাজার ২০ কোটি টাকা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ পেয়েছে ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। সার ও অন্যান্য খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এ সহায়তা পেয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৪ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বা মোট ভর্তুকির প্রায় ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ আরো বেড়ে ৯১ হাজার ৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিপিডিবিকে বড় অংকের লোকসান থেকে বের করে আনতে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় কমানোই এখন আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এক্ষেত্রে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়িয়ে উচ্চ মূল্যের জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।’

তবে বিপিডিবির আর্থিক চাপ রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে মো. রেজাউল করিম আরো বলেন, ‘বিপিডিবি একক ক্রেতা হিসেবে সব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার দায়িত্ব পালন করে এবং এ ব্যবস্থায় সরকারের ভর্তুকিরও প্রয়োজন হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ বকেয়া দায় একবারে মেটানোর কোনো সহজ ব্যবস্থা নেই। এটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হলো বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে বিপিডিবিকে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে একটি টেকসই অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

ভর্তুকির পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সরকার ১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এর বড় অংশ পেয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ১২২ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে ৬৬টি মুনাফা করেছে এবং বিপরীতে লোকসানে রয়েছে ৫৬টি। এর মধ্যে ২৪টি আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিট আয়, পরিচালন মুনাফা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ—তিনটিই নেতিবাচক। ফলে নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ভর্তুকি, অনুদান অথবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ তালিকায় ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল ছাড়াও ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি, গাজী ওয়্যারস, খুলনা ওয়াসা ও উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত এসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আর্থিক সুশাসনের মাপকাঠিতেও পিছিয়ে রয়েছে। ১২২টির মধ্যে ১১৫টি প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের কোনো বিরূপ মন্তব্য ছিল না। অন্যদিকে ৬৩টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নিরীক্ষক বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ নিরীক্ষকরা এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম, সীমাবদ্ধতা বা সংশোধনযোগ্য বিষয় শনাক্ত করেছেন। ৫১টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর নিরীক্ষকের বিরূপ মন্তব্য এসেছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের এসব ঝুঁকি বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচারে ব্যবস্থাপনাযোগ্য পর্যায়ে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক দুর্বলতা, উচ্চ ঋণ, নিম্ন মুনাফা, প্রচ্ছন্ন দায় এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে তা সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। এক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকির প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত পুনর্গঠন, পরিচালনা পর্ষদের তদারকি শক্তিশালী করা, আর্থিক প্রতিবেদন ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং সরকারি সেবা প্রদানের ব্যয় আলাদাভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন কাঠামোয় ইকুইটির অংশ অন্তত ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের বিরূপ মন্তব্যের কারণ অনুসন্ধান করে তা দূর করা, দীর্ঘদিনের পাওনা আদায়, ক্রমাগত লোকসানের কারণ শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পর্ষদে রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং বর্তমান ও সাবেক আমলাদের নিয়োগের বিষয়টি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের নিয়োগে এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কার্যকর পরিচালনার সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বিসিক ও বাংলাদেশ জুট করপোরেশনসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনা প্রাধান্য পেলে এসব প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব, সুশাসন ও পরিচালন দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সেগুলোকে একক কাঠামোয় না রেখে ব্যবসার ধরন ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে আলাদা শ্রেণীতে ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের অপচয় ও সরকারের আর্থিক চাপ কমাতে এগুলোকে চার শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে—বেসরকারীকরণ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং সরকারের মালিকানায় রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনা। যেসব খাতে বেসরকারি খাত এরই মধ্যে সক্রিয়, সেসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অব্যবহৃত সরকারি সম্পদ পিপিপির মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ব্যবহার করে আয় বাড়ানো যেতে পারে। আর একই ব্যবসায় সরকারি উপস্থিতি প্রয়োজন হলে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ মালিকানায় পরিচালনা করা যেতে পারে। যেসব খাতে বেসরকারীকরণ করলে একচেটিয়া বাজার তৈরি হয়ে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলো সরকারের মালিকানায় রাখা হলেও পেশাদারভাবে পরিচালনা করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানের পর্ষদে সংশ্লিষ্ট খাতের যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিতে হবে—এগুলোকে আমলাতন্ত্রের সম্প্রসারণ বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জায়গা করা যাবে না। তবে বেসরকারীকরণের আগে শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করা জরুরি।’

সম্প্রতি সরকার বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেশকিছু শিল্প গ্রুপ এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। এরই মধ্যে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের কাছে দুটি এবং হ্যামকো গ্রুপের কাছে একটি পাটকল ইজারা দেয়া হয়েছে। বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ই-বুকে বিজেএমসির ২৫টি বন্ধ পাটকলের মধ্যে ১৪টি স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া ছয় মাসের মধ্যে আরো ছয়টি বন্ধ পাটকল বেসরকারি অংশীদারত্বে পুনরায় চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে কীভাবে স্বচ্ছ, কার্যকর ও জনস্বার্থবান্ধবভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড বা ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত হবে, সেগুলো পেশাদারভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যেন লাভজনকভাবে টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে এসব কারখানার বিপুল জমি ও সম্পদ যাতে শিল্পের পরিবর্তে আবাসন ব্যবসায় পরিণত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’

সিপিডির এ সম্মাননীয় ফেলো আরো বলেন, ‘বিদ্যমান কারখানার পাশাপাশি এসব জমিতে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হলে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পাশাপাশি বিকল্প কারখানায় পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে শিল্প সম্পদ ও কর্মসংস্থান—দুটিই ধরে রাখা সম্ভব হবে।’