রাজধানী ঢাকার খোলাবাজার ও সুপারশপ থেকে সংগ্রহ করা চাল ও চিড়ার নমুনায় লিভার ক্যান্সার সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিন রাসায়নিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। গবেষণায় চালের ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ ও চিড়ার ৫৫ শতাংশ নমুনায় এ বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়েছে। ‘বাংলাদেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়া চাল ও চালজাত পণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি: খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আফলাটক্সিনের সংস্পর্শ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘টক্সিকোলজি রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

আফলাটক্সিন মূলত নির্দিষ্ট কিছু ছত্রাক দ্বারা উৎপাদিত প্রাকৃতিক ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। গরম ও আর্দ্র পরিবেশে ঠিকমতো না শুকানো বা সংরক্ষণ না করা খাদ্যশস্যে এ ছত্রাক জন্মায়। আফলাটক্সিনের দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া লিভার সিরোসিস, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে। নমুনাগুলোতে আফলাটক্সিনের মাত্রা নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ সীমার নিচে ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করলেও দীর্ঘদিন নিয়মিতভাবে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

নমুনায় আফলাটক্সিনের মাত্রা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার নিচে থাকলেও নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে এসব খাদ্য গ্রহণে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা হতে পারে, তা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেছেন গবেষকরা। এজন্য তারা মার্জিন অব এক্সপোজার (এমওই) সূচক ব্যবহার করেছেন। এ সূচকের মান যত বেশি, ঝুঁকি তত কম বলে ধরা হয়। সাধারণভাবে এমওই ১০ হাজারের নিচে হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। গবেষণায় চালের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের এমওই পাওয়া গেছে ৮ দশমিক ৩৬ ও শিশুদের ৪ দশমিক ৮৯। চিড়ার ক্ষেত্রে এ মান ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ৭৭১ দশমিক ৪০ ও ১ হাজার ৫ দশমিক ৭১। অর্থাৎ চাল ও চিড়া দুই ক্ষেত্রেই মান ১০ হাজারের নিচে ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন নির্দেশ করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চালে আফলাটক্সিন কেন তৈরি হয়েছে, সেটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এর একটি কারণ হতে পারে। দূষণের মাত্রা হয়তো এখন খুব ক্ষতিকর পর্যায়ে পৌঁছেনি, তবে এটিকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। একই সঙ্গে দূষণ কমাতে কী করণীয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

গবেষণায় নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিন পরীক্ষা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, শুকানো, পরিবহন ও সংরক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে ভালো কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

গবেষণাটির ১১ গবেষকের মধ্যে নয়জনই বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী। বাকি দুজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান এবং প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজির (আইএফআরবি) ভেটেরিনারি ড্রাগ রেসিডিউ অ্যানালাইসিস বিভাগের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার মো. হেদায়েতুল ইসলাম ও ড. নজরুল ইসলাম।

গবেষকরা রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও সুপারশপ থেকে মোট ১২১টি নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে চালের নমুনা ছিল ৭৬টি, মুড়ির ২৫ ও চিড়ার ২০টি। নমুনাগুলো দুই দফায় সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়। প্রথম দফায় ২০২২ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত (গরম ও বর্ষা মৌসুমে) এবং দ্বিতীয় দফায় ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (শীত ও শুষ্ক মৌসুমে) নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকার বাজারে আসে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাভারের ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজির ভেটেরিনারি ড্রাগ রেসিডিউ অ্যানালাইসিস বিভাগে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তরল ক্রোমাটোগ্রাফি ও ফ্লুরেসেন্স ডিটেকশন (এইচপিএলসি-এফএলডি) পদ্ধতিতে আফলাটক্সিন শনাক্ত ও পরিমাপ করা হয়। গবেষণায় আফলাটক্সিনের চারটি ধরন—এএফবি১, এএফবি২, এএফজি১ ও এএফজি২ পরীক্ষা করা হয়। এ চারটির সম্মিলিত পরিমাণকে টোটাল আফলাটক্সিন বা এএফটি হিসেবে ধরা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা যায়, ৭৬টি চালের নমুনার মধ্যে ২১টি বা ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশে আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে। এসব নমুনায় মোট আফলাটক্সিনের ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে দশমিক ৪৭ থেকে ৩ দশমিক ৬৩ মাইক্রোগ্রাম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট আফলাটক্সিনের সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা ৪ মাইক্রোগ্রামের নিচে। অর্থাৎ মোট আফলাটক্সিনের হিসাবে গবেষণায় পাওয়া সর্বোচ্চ মাত্রাও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেনি।

অন্যদিকে ২০টি চিড়ার নমুনার মধ্যে ১১টিতে বা ৫৫ শতাংশে আফলাটক্সিন শনাক্ত হয়েছে। এসব নমুনায় এর ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে দশমিক ৩৭ থেকে দশমিক ৮৭ মাইক্রোগ্রাম। চিড়ায় পাওয়া সর্বোচ্চ ঘনত্বও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত মোট আফলাটক্সিনের সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা ৪ মাইক্রোগ্রামের নিচে রয়েছে। অন্যদিকে ২৫টি মুড়ির নমুনার কোনোটিতেই আফলাটক্সিন শনাক্ত হয়নি।

মৌসুমভেদেও দূষণের হারে কিছু পার্থক্য পেয়েছেন গবেষকরা। প্রথম দফায় (গরম ও বর্ষা) চালের ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ নমুনায় আফলাটক্সিন পাওয়া যায়। দ্বিতীয় দফায় এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দফায় করা গবেষণার নমুনায় গড়ে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি মিলেছে। চিড়ার ক্ষেত্রে প্রথম দফায় ৬০ শতাংশ ও দ্বিতীয় দফায় ৫০ শতাংশ নমুনায় দূষণ শনাক্ত হয়। অর্থাৎ গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে দূষণের হার তুলনামূলক বেশি ছিল।

চিড়ায় দূষণের হার চালের তুলনায় বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় গবেষকরা বলছেন, ধান ভিজিয়ে উত্তাপ প্রয়োগের পর যান্ত্রিকভাবে চ্যাপ্টা করে চিড়া তৈরি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় দানার উপরিভাগ ও তুষের অংশের সংস্পর্শ এবং আর্দ্রতা ছত্রাকের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপর্যাপ্ত শুকানো, আর্দ্র পরিবেশে উৎপাদন এবং অনুপযুক্ত সংরক্ষণের কারণে অ্যাসপারজিলাস গোত্রের ছত্রাকের বিস্তার ও আফলাটক্সিন উৎপাদন বাড়তে পারে। অন্যদিকে উচ্চ তাপমাত্রায় মুড়ি তৈরি এবং শুকনো ও বায়ুরোধী পরিবেশে সংরক্ষণের কারণে এতে ছত্রাক বৃদ্ধির সুযোগ কমে বলে গবেষকদের ধারণা।

গবেষণায় চালের মাধ্যমে আফলাটক্সিন গ্রহণের কারণে সম্ভাব্য লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও হিসাব করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রায় দশমিক শূন্য ৫১টি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে দশমিক শূন্য ৮৮টি লিভার ক্যান্সারের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষণায় ছত্রাকের বিস্তার রোধে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, উন্নত শুকানো ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত দূষণ শনাক্তের প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও মৌসুম থেকে বড় পরিসরে নমুনা সংগ্রহ করে আফলাটক্সিনের পাশাপাশি অন্যান্য মাইকোটক্সিন পরীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে। মানুষের শরীরে আফলাটক্সিনের প্রকৃত সংস্পর্শ কতটা, তা নিরূপণে রক্ত ও প্রস্রাবের বায়োমার্কার পরীক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

আফলাটক্সিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আফলাটক্সিন লিভারের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে ১৫-১৬ গুণ মাত্রায় আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।’