দেশের সবচেয়ে বেশি চিংড়ি উৎপাদনকারী জেলা বাগেরহাটে গলদা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে দরপতনের কারণে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষীরা। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং, খরাসহ নানা সমস্যার পরে এখন এ দরপতন অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনে আকার ও ওজনের ভিত্তিতে বাগেরহাটে গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে কমেছে ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। সম্ভাবনাময় এ শিল্পে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈশ্বিক সংকট এবং মহামারী করোনায় রফতানি কমে যাওয়ায় চিংড়ি নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন চাষীরা। চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন চাষী ও জনপ্রতিনিধিরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গিয়েছে, দেশের মোট চিংড়ির বেশির ভাগই খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজারে উৎপাদিত হয়। তবে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় যে ৮০ শতাংশ চিংড়ি উৎপাদিত হয়, তার অর্ধেকই (৪০ শতাংশ) বাগেরহাটের।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাট জেলায় ৬৬ হাজার ৭১৩ হেক্টর জমিতে ৭৮ হাজার ৬৮৫টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। ১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৩ হাজার টন গলদা বাগদা উৎপাদন হয়েছে, এই বছর রফতানি হয়েছে ২৫ হাজার ৫৩০ টন। পরের বছর ১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৩৮ টন, রফতানি হয় ২৪ হাজার ৪১৩ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৯৪২ টন। যা থেকে রফতানি হয়েছিল ২৩ হাজার ৬৮ টন। ২০-২১ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ৮৫৮ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে এ জেলায়। রফতানি হয়েছে ২৩ হাজার ৩৬৭ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩৯ হাজার ৮৭৮ টন। এ বছর রফতানি হয়েছে ২৪ হাজার ১০৪ টন।
বাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে খাবারের দাম অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এক বছর আগে ৩৫ কেজি ভুসি ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হলেও, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকা, ডাল ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা বর্তমানে ২ হাজার ৮০০ টাকা, প্রক্রিয়াকরণ খাবার ফিশ ফিড কোম্পানিভেদে ২৫ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এদিকে চিংড়ি মাছের দাম কমেছে আকার ও ওজনভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এক বছর আগে যে চিংড়ির কেজি ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা, বর্তমানে ৯০০ টাকা, যেটা ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা তা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। যা ছিল ৯০০ টাকা তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা।
ফকিরহাট উপজেলার কাকডাঙ্গা এলাকার চিংড়ি চাষী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে চিংড়ি মাছ চাষ করি। কখনো লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি। এবার খাবারের দাম বৃদ্ধি এবং ভরা মৌসুমে হঠাৎ করে চিংড়ি দাম কমে যাওয়ায় খুব বিপদে পড়েছি। গত বছর ১৬ কাঠা জমিতে চিংড়ি চাষ করে ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এবার ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে বর্তমান বাজারদরে ৭০ হাজার টাকা লোকসান হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
মো. কামাল হোসেন মোল্লা নামের এক চাষী বলেন, ‘আমি ৩ লাখ টাকা ব্যয় করে দুই বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করেছি। এবার চিংড়ির খাবারের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় পুঁজি ওঠা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। যদি বাজারদর পরিবর্তন হয়, তাহলেও কম লোকসানে পড়তে হবে। বছরের শুরুতেই বাজারদর পড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আমরা যারা প্রান্তিক চাষী রয়েছি আমাদের চাষ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
মেসার্স পদ্মা মৎস্য আড়তের মালিক ওমর আলী বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে চিংড়ি ব্যবসায় একটি অসাধু সিন্ডিকেট রয়েছে। যাদের কারসাজির কারণে ভরা মৌসুমে চিংড়ি চাষীরা মাছ বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এই সিন্ডিকেট ছাড়া যদি সরাসরি কোম্পানিতে মাছ বিক্রি করা যায়, তাহলে চিংড়ি ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন যাতে সরাসরি কোম্পানিগুলো চাষীদের কাছ থেকে মাছ ক্রয় করে তাহলে চাষীরা বেঁচে যাবে।’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে চিংড়ি দাম কমে যায়। তারা নিয়ে মজুদ করেন। নানা কারসাজি করেন। এজন্য চাষীরা লোকসানে পড়েন। এভাবে চলতে থাকলে চিংড়ি চাষ শেষ হয়ে যাবে।’
ফকিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিরীনা আক্তার বলেন, ‘বাগেরহাট চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু মাছের খাবারের দাম ও মাছের দামের পার্থক্যের কারণে চাষীরা চিংড়ি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। চিংড়ি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে চাষীদের প্রণোদনাসহ খাবারের দাম কমাতে হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল বলেন, ‘বৈশ্বিক মন্দা, করোনাসহ নানা কারণে চাষীরা একটা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার পরও বাগেরহাটে চিংড়ি উৎপাদন কমেনি। তবে দাম কম হওয়ায় কিছুটা বিপাকে রয়েছেন চাষীরা।










