‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি: বৈষম্য ও অধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে
বক্তারা বলেন, কয়েক দশকে বাংলাদেশ সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, কিন্তু সে অর্জনের
সুফল সবার ঘরে পৌঁছায়নি। যার প্রেক্ষিত অরক্ষিত ও বঞ্চিতদের জন্য নেয়া হয়েছে সামাজিক
নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি। বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বহুবিধ চ্যালেঞ্জের
সম্মুখীন। জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এ খাতে ব্যয় হলেও কর্মসূচিসমূহের প্রকৃত প্রভাব
প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র (এনএসএসএস) নিঃসন্দেহে একটি
ভালো উদ্যোগ। তবে কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের বাছাই প্রক্রিয়া এবং সুবিধাসমূহ বণ্টনে
সুষ্ঠুতা, অনিয়ম ও বৈষম্য রয়েছে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়নাধীন
এসব কার্যক্রমের যথাযথ মনিটরিং হয় না; পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের পরে উপকারভোগীদের অবস্থার
মূল্যায়ন এবং মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী পরিকল্পনা প্রণয়নেরও তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক
কাঠামো বা ব্যবস্থা নেই। ফলে সংখ্যাগত দিক থেকে কত মানুষের দারিদ্র্য অবস্থার উন্নয়ন
হলো বা হলো না, তারও যথাযথ বা সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকার দ্য ডেইলি
স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ওয়েভ ফাউন্ডেশনের
আয়োজনে এ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মহসিন
আলীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পরিচালক
জাকিয়া আফরোজ। এছাড়া অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান
এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ব্যাংকিং অ্যান্ড ইস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ উন্নয়ন
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. এস এম জুলফিকার আলী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব
ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর, সমাজসেবা
অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (নিবন্ধন) আইয়ুব খান, কেয়ার বাংলাদেশের চিফ অব পার্টি (থ্রিভ
এক্টিভিটি) আমানুর রহমান।
সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ এম. শাহান, প্রকল্পের পক্ষে বক্তব্য
উপস্থাপন করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মীর মোস্তাক আহমেদ, এবং স্বাগত
বক্তব্য রাখেন ও সঞ্চালনা করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা।
সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে মহসিন আলী বলেন,
ওয়েভ ফাউন্ডেশন টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায্যতা, সুশাসন, অধিকার ও ন্যায্যতা এ বিষয়গুলো
নিয়ে কাজ করছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে সাফল্য এসেছে সেক্ষেত্রে আমাদের পদ্ধতিগত সংস্কার
এবং তা বাস্তবায়ন সময়ের দাবী।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. আসিফ এম. শাহান
বলেন, ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল বা এনএসএসএস গৃহীত হয়। এনএসএসএস প্রবর্তনের
৯ বছর পরেও বিপুল সংখ্যক লোক এখনও এই কর্মসূচির আওতায় আসেনি।
জাকিয়া আফরোজ বলেন, সরকার ভিডব্লিউবির মাধমে
নারী ও শিশু সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে কর্মসূচি বাস্তবায়নে এখনও নিড অ্যাসেসমেন্ট
হয়নি। যার ফলে আমাদের প্রকৃত উপকারভোগীর সংখ্যা নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুবিধাভোগী
সিলেকশনের ক্ষেত্রে সঠিক মানুষকে সিলেকশন করতে পারাটাও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা ২ হাজার
১৯৫ কোটি টাকা বাজেট পেয়েছি। ১০ লাখ ৪৪ হাজার লোক এ সুবিধা পাচ্ছে। প্রতিবছর ১০ শতাংশ
করে সুবিধাভোগী বাড়ানোর কথা কিন্তু বাজেট সল্পতার জন্য সেটা সম্ভব হয় না। ৩০ কেজি চাল
দিলে দারিদ্র দূর হবে কিনা সেটাও অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে।
অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, আমরা সামাজিক
সুরক্ষা কাকে দিতে চাচ্ছি, প্রকৃত উপকারভোগী লক্ষ্য অনুসারে কর্মসূচির আওতায় আসছে কিনা
এ বিষয়গুলো অস্পষ্ট।
ড. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দারিদ্র্যের
দুষ্টচক্র উত্তরণে আমাদের মত প্রকাশের অধিকার আছে কিনা তা এখন আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের
দারিদ্র্য বিমোচনে শুধু মৌলিক চাহিদার কথা চিন্তা করলে হবে না, সামগ্রিক প্রেক্ষাপটও
বিবেচনা করতে হবে। সেজন্য দায় দায়িত্ব কেবল সরকারের নয় বরং আত্ম উন্নয়নে নিজেকে এগিয়ে
নিতে হবে।
ড. এস এম জুলফিকার আলী বলেন, আমরা এখনো উপকারভোগী
ঠিকমতো বাছাই করতে পারি না সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের ক্ষেত্রে। বর্তমান সরকারের এখন একটা
সুযোগ এসেছে নির্মোহভাবে এ তালিকা তৈরির ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের। নিরাপত্তা বেষ্টনির
সেবাগুলোকে যত ডিজিটালাইজেশন করা যাবে, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া তত স্বচ্ছ
হবে। এ কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে।
ড. মাহফুজ কবীর বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির
পরিসর বিস্তৃত। আমাদের মৌলিক এবং গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের
নির্বাচনে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান এবং প্রকৃত উপকারভোগী প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে
হবে। সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে যে কমিটি আছে সেখানে ভবিষৎ প্রজন্মের প্রতিনিধি থাকতে হবে।
আমানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষার
কর্মসূচিগুলো সর্বজনীন করে জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সম্পৃক্ত করে
অভিযোগের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে।










