শ্রমজীবী মানুষকে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাদের টেকসই নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সম্মেলন ও সাধারণ সভার মাহ্দী আমিন এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, শ্রমিক শুধু শ্রম দেন না, তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে দেশের মর্যাদা নিশ্চিত করা। ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রতিটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। শ্রমিকের কল্যাণ মানে শুধু একজন কর্মীর কল্যাণ নয়, একটি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দক্ষ শ্রমিক দেশের অন্যতম বড় উৎপাদনশীল সম্পদ। শ্রমিকের দক্ষতা বাড়লে শিল্পের সক্ষমতা ও দেশের প্রতিযোগিতার শক্তি বাড়ে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকের দক্ষতাকেও এগিয়ে নিতে হবে। নতুন শিল্প ও নতুন কর্মসংস্থানের জন্য আগামী প্রজন্মের শ্রমশক্তিকে প্রস্তুত করার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শ্রমিকের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বিনিয়োগ করার উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র।
শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক এবং অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।মা হ্দী আমিন বলেন, শিল্পের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিককে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক হয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের ‘ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ ব্যবস্থা’ (ট্রাইপারটাইট কনসালটেশন)-এর মাধ্যমেই শিল্প খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র আরো বলেন, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার থাকলে আস্থা তৈরি হয়, আর আস্থা থাকলে উৎপাদন বাড়ে। নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের নিশ্চিয়তা অর্থনীতির সক্ষমতাও বাড়ায়। কর্মসংস্থানের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই কর্মসংস্থানের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমিকের সন্তান যেন আরো ভালো শিক্ষা ও বড় স্বপ্নের সুযোগ পায়, এটিও শ্রমিক কল্যাণের অংশ। আজকের শ্রমশক্তিকে আগামী দিনের পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করাই হবে বড় বিনিয়োগ বলে জানান তিনি।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে মাহ্দী আমিন, দক্ষ শ্রমিকই দেশের প্রধান উৎপাদনশীল সম্পদ। প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা করার শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন শিল্প ও মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে এখন থেকেই আধুনিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে এ উপদেষ্টা কর্মসংস্থানের পরিমাণের পাশাপাশি কাজের মান (ডিসেন্ট জব) এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেন।
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্জনে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষ বারবার রাজপথে নেমে এসেছেন। নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণ, জনগণের অধিকার এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁদের এই সাহসী অবস্থান জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী জনশক্তির বিপুল সম্ভাবনা ও চাহিদার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সুসংহত মেলবন্ধন ঘটলে এ দেশের শ্রমিকদের অপার সম্ভাবনা সারা বিশ্বে আরো সমাদৃত হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমজীবী মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্প খাতের বাস্তবতার নিরিখে টেকসই সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এমন একটি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ একই স্রোতোধারায় প্রবাহিত হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল্যাবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তিন দশকের পথচলা ও শ্রম অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি বলেন, শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের স্বাধীনতা ও সুরক্ষায় বিলস দীর্ঘদিন ধরে একটি বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে আসছে।
সম্মেলন ও সাধারণ সভায় আরো বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও কৃষি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিলসের মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার-আইএলও'র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল লেবার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসুনোবু আইহারা, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর জ্যানা ভ্যান ডার লিনডেন, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ জকরিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার, বিলসের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়াসহ দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।










