চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের উৎপাদন বছরের ব্যবধানে কমেছে ২৩ হাজার টন। গত মৌসুমে আমন উৎপাদন রেকর্ড ১৬ লাখ ২৫ হাজার টন হলেও চলতি মৌসুমে সেই উৎপাদন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১ হাজার ৭৮৪ টনে। সরকারের দেয়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও অন্য বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আবাদে দেরি, ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং গড় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি-বিশ্লেষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে চলতি মৌসুমে মোট পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়। এ অঞ্চলে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ লাখ ৯ হাজার ৮৮৩ টন চাল। মৌসুম শেষে ধান কাটার পর ফলন দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১ হাজার ৭৮৪ টনে। গত বছর এ অঞ্চলের উৎপাদন হয়েছিল ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৭১৪ টন। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে এবার গত মৌসুম থেকে আবাদ কমেছে ৩৩৭ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ২২ হাজার ৯৩০ টন। গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আমন ছিল এ অঞ্চলের রেকর্ড উৎপাদন।
এ অঞ্চলে হাইব্রিড জাতের আমন ১১ হাজার ৫১৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৪৬ হাজার ৫৯২ টন এবং গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক শূন্য ৫ টন। উফশী জাতের আমন ৪ লাখ ৮৮ হাজার ২২৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৫৮৬ টন। গড় ফলনের হার ছিল হেক্টর প্রতি ২ দশমিক ৯৩ টন। এছাড়া স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ হয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার ৭৫ হেক্টরে। উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ২৩ হাজার ৬০৭ টন। গড় ফলনের হার ১ দশমিক ৬৯। মূলত উফসি জাতের ধানের আবাদ গত বছরের তুলনায় বেশি হলেও ফলনের হার কমে যাওয়া এবং স্থানীয় জাতের আবাদ কমে যাওয়ায় আমন উপাদন কমেছে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় হাইব্রিড, উফসী ও স্থানীয় জাত মিলে মোট ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৭১ হেক্টর জমিতে উপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৮৯৪ টন চাল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আবাদ এবং উৎপাদন কমেছে যথাক্রমে ২ হাজার ৬৬৯ হেক্টর এবং ১৫ হাজার ৭৬৫ টন চাল। সরকারের দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৭০৫ টন চাল উৎপাদনের। অন্যদিকে
কক্সবাজার জেলায় আবাদ হওয়া ৭৮ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে সরকারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৭৫৫ টন চাল। সেখানে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৭১ টন চাল। বছরের ব্যবধানে এ জেলায় আবাদ কমেছে ১৮৩ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ১৪ হাজার ৯৭৭ টন চাল।
নোয়াখালী জেলায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ২১৯ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৯৩ টন চাল। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৩০৬ টন। ফেনী জেলায়
৬৬ হাজার ৭৪০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৩৬৪ টন চাল। বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ১৩১ টন চাল। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪১ টন চাল উৎপাদনের। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ জেলায় ২৯০ হেক্টর জমির উফশী জাতের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে লক্ষ্মীপুর জেলায় ৮১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬৩ টন চাল। এ জেলায় বছরের ব্যবধানে ৪৯০ হেক্টর ফসল আবাদ কম হলেও উৎপাদন বেড়েছে ৩ হাজার ৯০৭ টন চাল। যদিও সরকারী লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৭৭৬ টন চাল উৎপাদনের।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. মোফাজ্জল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের দেয়া লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আমন উৎপাদন বেড়েছে। ফেনীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বেশকিছু আমন নষ্ট হয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা এবং গড় ফলনের হার কমে যাওয়ার কারণে গত বছরের তুলনায় আমনের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। আশা করছি আসন্ন বোরো মৌসুমে আমনের ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে। তাছাড়া বাজারে ধানের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আমরা কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছি।
কৃষকরা মনে করেন, বাজারে চালের দাম ধাপে ধাপে বাড়লেও ধানের ক্ষেত্রে উল্টো প্রথা। বাজারে ধান বিক্রি করতে গেলে ধানের দাম পাওয়া যায় না। ধান কাটার শুরুর দিকে কৃষক ধানের ভালো দাম পেলেও পরে দামের নিম্নমুখিতা লক্ষ্য করা যায়। সরকার যদি ভালো দামে কৃষক থেকে আমন ধান সংগ্রহ করে তাহলে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে।










