রোহিঙ্গা সংকট এক দশকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে কক্সবাজারের এনজিও প্ল্যাটফর্ম “সংহতির দশ বছরের পথে: জরুরি মানবিক সাড়াদান থেকে টেকসই সমাধানের দিকে” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দাতা সংস্থা, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, সুশীল সমাজ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের বিভিন্ন অংশীজন অংশগ্রহণ করেন।

কক্সবাজারের আয়োজিত এ সংলাপে গত নয় বছরের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা পর্যালোচনা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগণের বর্তমান জরুরি প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার চিহ্নিতকরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট থেকে টেকসই সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি যৌথ ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

২০২৬ সালের মে মাস থেকে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এনজিও প্ল্যাটফর্মের হোস্টিং এজেন্সি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটি ১৮২টি স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওকে একত্রিত করেছে এবং রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নিয়োজিত বেসরকারি ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে।

আলোচনায় প্রায় এক দশকের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম থেকে অর্জিত শিক্ষা কাজে লাগানোর পাশাপাশি পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও শক্তিশালী ও সম্মিলিত চিন্তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন, বিদ্যমান ঘাটতি এবং মর্যাদা ও সহনশীলতা জোরদারের অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

একই সঙ্গে মানবিক, উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষ কীভাবে সম্মিলিতভাবে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অবদান রাখতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদি জরুরি সাড়াদান থেকে দীর্ঘমেয়াদি সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।

গোলটেবিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল, সমাধান কেবল ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ও তাদের সঙ্গে নিয়ে তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, এনজিও, সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নির্ধারণে কমিউনিটির কণ্ঠস্বরকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

সংলাপে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সংহতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহনশীলতা, মর্যাদা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীরা গত নয় বছরের ভালো অভিজ্ঞতা ও শেখা বিষয়, বর্তমান চ্যালেঞ্জ, জরুরি অগ্রাধিকার এবং দশম বছরে আরো ভালোভাবে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।

গোলটেবিলটি দুটি কৌশলগত অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, এনজিও, সুশীল সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বর্তমান চাহিদা ও অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে সরকারি ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সহনশীলতা, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে ভবিষ্যতমুখী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং বৃহত্তর এনজিও কমিউনিটির প্রতিনিধিদের মতামত একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৌশলগত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্ব দিয়ে এনজিও প্ল্যাটফর্ম উল্লেখ করে যে, ভবিষ্যতের পথনকশা তৈরিতে বিগত বছরগুলোর শিক্ষা কাজে লাগানোর পাশাপাশি পরিবর্তিত বাস্তবতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আন্তর্জাতিক সংহতি অব্যাহত রাখা, স্থানীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয়করণ আরও শক্তিশালী করা, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহনশীলতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

আলোচনায় রোহিঙ্গা শিশু ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ভবিষ্যৎ কৌশলের কেন্দ্রে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। তাদের সুরক্ষা, শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং অর্থবহ সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে একটি পুরো প্রজন্ম কেবল বাস্তুচ্যুতির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না হয়ে পড়ে।

সংলাপের সমাপনীতে এ বিষয়ে অভিন্ন উপলব্ধি উঠে আসে যে, রোহিঙ্গা সংকট একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। সরকার, মানবিক ও উন্নয়ন সংস্থা, দাতা, সুশীল সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, সবারই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এনজিও প্ল্যাটফর্ম তার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও সমন্বয়মূলক ভূমিকার মাধ্যমে কার্যকর সমন্বয় জোরদার, কমিউনিটির কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসা, মানবিক ও উন্নয়ন অংশীজনদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ তৈরি এবং রোহিঙ্গা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে বলেও জানান হয়।