পোষা বিড়ালের সঙ্গে খেলতে গিয়ে শিশুর হাতে দাঁত বসিয়ে দেয়া, সিঁড়িতে ওঠার সময় বিড়ালের গায়ে পা পড়ায় যুবকের পায়ে আঁচড় বা কামড়, আবার একই ব্যক্তিকে কিছুদিনের ব্যবধানে একাধিকবার বিড়ালের আঁচড়-কামড়ের কারণে র্যাবিস টিকা নিতে হচ্ছে—কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে এখন এমন ঘটনা নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে। কুকুরের কামড়ের চেয়ে পোষা বিড়ালের আঁচড় ও কামড়েই চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি। ফলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার চাহিদাও বাড়ছে।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পশুর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা ও র্যাবিস টিকা নিয়েছেন ১২ হাজার ৬৮১ জন। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ৫৮৫ এবং প্রতিদিন গড়ে ৫২ জন পশুর কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। আগস্টে রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৮১, যা চলতি বছরের আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জানুয়ারিতে পশুর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা ও টিকা নেন ১ হাজার ৭১২ জন। ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮৯, মার্চে ১ হাজার ১৮৭, এপ্রিলে ১ হাজার ৫৩৭, মে মাসে ১ হাজার ৫০৮, জুনে ১ হাজার ৬৫৯ ও জুলাইয়ে ১ হাজার ৬০৮ জন চিকিৎসা নেন। আগস্টে এসে এ সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮১ জনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ হিসাব শুধু কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের। জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর তথ্য যুক্ত হলে পশুর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। আবার অনেকে সরকারি হাসপাতালে না গিয়ে বেসরকারিভাবে ফার্মেসি থেকে টিকা নেয়ায় সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্রের পুরোটা প্রতিফলিত হচ্ছে না।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনের হিসাবেও বিড়ালের আঁচড়-কামড়ের আধিক্য স্পষ্ট। এ সময়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত ১ হাজার ১৫০ জনকে র্যাবিস টিকা দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৬ জনই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত। এ সময় কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে টিকা নিয়েছেন ১২০ জন, বানরের কামড় বা আঁচড়ে তিনজন ও শেয়ালের কামড়ে একজন। অর্থাৎ, ওই ১৫ দিনে টিকা নেয়া মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশই বিড়ালের কারণে হাসপাতালে এসেছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইকবাল হাসান বলেন, ‘কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন তুলনামূলক কম। অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের ঘটনাও কম। তবে বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আক্রান্তদের প্রায় ৯৫ শতাংশই পোষা বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের শিকার। এমন ঘটনাও ঘটছে, যেখানে একজন ব্যক্তি এক মাস আগে র্যাবিস টিকা নেয়ার পর আবার বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের কারণে হাসপাতালে আসছেন।’
পোষা প্রাণীর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় গত এক-দুই বছরে পোষা প্রাণীর খাবার ও পরিচর্যা সামগ্রীর দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব দোকানে বিড়াল-কুকুরের খাবারের পাশাপাশি ওষুধ ও পরিচর্যার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে।
হাসপাতালে টিকা নিতে আসা কয়েকজনের অভিজ্ঞতায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। কুষ্টিয়া শহরের বটতলা এলাকার বাসিন্দা স্বপ্না খাতুন তার মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন পোষা বিড়ালের কামড়ের পর। বিড়ালের সঙ্গে খেলার সময় মেয়েটিকে কামড় দেয়ার পর তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। শহরের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসের আলী জানান, বাড়ির সিঁড়িতে শুয়ে থাকা বিড়ালের গায়ে অসাবধানতাবশত পা পড়লে সেটি তাকে কামড় দেয়। এর আগেও একই বিড়াল তাকে আঁচড় দিয়েছিল এবং তখনো তাকে টিকা নিতে হয়েছিল।
হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা জানান, টিকার চাহিদা সাম্প্রতিক সময়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একদিনে ৫৬৩টি পর্যন্ত টিকা দেয়ার নজির রয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০০-২৫০টি টিকা দিতে হচ্ছে। এতে র্যাবিস প্রতিরোধে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
ডা. ইকবাল হাসান বলেন, ‘পোষা বিড়াল বা কুকুর বাইরে গেলে কিংবা বাইরের প্রাণীর সঙ্গে মিশলে তার আঁচড় বা কামড়ের মাধ্যমে জলাতঙ্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দেয়া এবং তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।’ তবে তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার র্যাবিস টিকা না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন।
জলাতঙ্ক মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত প্রাণীর লালা কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে কুকুর, বিড়ালসহ যেসব প্রাণী মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে টিকাদান ও নিয়ন্ত্রিত চলাচল গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান দ্রুত পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে র্যাবিস প্রতিরোধী টিকা নেয়া জরুরি।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) সহসভাপতি শাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, ‘পশু পালনের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। প্রাণীর যথাযথ পরিচর্যা ও টিকাদানের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রাণী আঁচড় বা কামড় দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার।’
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনও সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিড়াল-কুকুরসহ কোনো প্রাণী বাড়িতে আনার আগে তার টিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পোষা প্রাণীটি যাতে বাইরের অন্য প্রাণীর সংস্পর্শে না আসে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।’ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় বর্তমানে র্যাবিস প্রতিরোধী টিকার সংকট নেই বলেও জানান তিনি।










