পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলবাসী। দেশের দীর্ঘতম এ সেতু চালু হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, উন্নয়নে ঘটবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাবে। গড়ে উঠবে একের পর এক শিল্প-কারখানা। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান, মিলবে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। উন্নয়নমূলক মহাকর্মযজ্ঞ পাল্টে যাবে বরিশালসহ দক্ষিণের ২১ জেলার চেহারা। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল কৃষি পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে অল্প সময়ের পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, এ সেতুর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্য বাড়াতে মোংলাবন্দর ব্যবহার করা যাবে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ২১টি জেলা তিনটি বিভাগের অন্তর্গত। এগুলো হচ্ছে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা। ঢাকা বিভাগের পাঁচ জেলা ও খুলনা বিভাগের ১০ জেলা। স্বাধীনতার পর থেকে এ জেলাগুলো ছিল অবহেলিত। বর্তমান সরকার এসব জেলায় উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বার উন্মোচিত হলো পদ্মা সেতুর। পদ্মা সেতুর সঙ্গে এ অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। দেশের বড় তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ সেতুর কারণে আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বেড়ে যাবে। পায়রা বন্দর, সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, ঢাকা-বরিশাল চার লেন সড়ক, শেরেবাংলা নৌঘাঁটি ও ইপিজেড স্থাপিত হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোনে পরিণত হবে। পদ্মা সেতু ঘিরেই উদ্যোক্তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগের ডালা খুলে বসেছেন। গ্রহণ করা হচ্ছে অসংখ্য মেগা প্রকল্প। আবাসন শিল্প, পোশাক শিল্প, পর্যটন শিল্প, হাইটেক পার্ক, তাঁতপল্লীসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কের আশপাশে দেশের ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকরা জমি ক্রয় করেছেন। পায়রা বন্দর এলাকার আশপাশে জমি ক্রয় করেছে মদিনা গ্রুপ ও এমএম বিল্ডার্স নামের প্রতিষ্ঠান। সাগরকন্যা কুয়াকাটায় এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে শতাধিক হোটেল-মোটেল। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার খাজুরা, গঙ্গামতী, কাউয়ার চর, ভোলা ও পটুয়াখালীর চরাঞ্চল এবং বরিশাল ও এর আশপাশে জমি ক্রয় করেছে সিকদার গ্রুপ, ইউএস বাংলা, সেঞ্চুরি, বসুধা, ওয়েস্টার্নসহ কমপক্ষে ১৫টি ভারি শিল্পমালিক। এসব স্থানে কোম্পানিগুলো নির্মাণ করবে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কলকারখানা ও বহুতল ভবন। কুয়াকাটায় নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে ১৭ তলা ভবনের ওয়াচ টাওয়ার। সরকারের মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় হবে আধুনিক পর্যটন এলাকা কুয়াকাটা। থাকবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্টেডিয়ামসহ বহু স্থাপনা।
একই সঙ্গে ঝালকাঠির তাঁত শিল্প অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এখানে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে শীতলপাটি এক বিরাট স্থান দখল করে এসেছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শীতল পাটি কিনতে গ্রীষ্মকালে ঝালকাঠিতে আসে।
বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে বরিশাল হবে ভবিষ্যৎ শিল্প ও বাণিজ্য নগরী। এতে করে একদিকে যেমন সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে, তেমনি বাড়বে কর্মসংস্থান। এখন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকা-বরিশাল চার লেন সড়ক ব্যবস্থা চালু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রূপা ফ্যাব্রিক্স অ্যান্ড রূপা নিটওয়ারের কর্ণধার শামসুল আলম চুন্নু বলেন, রাজধানীর সঙ্গে মাত্র ৪ ঘণ্টার দূরত্ব বরিশালের। তাই শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, বরিশালের গ্রাম পর্যায়ে কাজ করার চিন্তা করছি আমরা। শিগগিরই পদ্মা সেতুর সুফল পাবে বরিশালের মানুষ।
ইউজোম গ্রুপের স্বত্বাধিকারী মর্তুজা খান বলেন, অবশ্যই আমরা বরিশালে বিনিয়োগ করব। বরিশালের উন্নয়ন ঘটবে অভূতপূর্ব। আমরাই তো বরিশালে পোশাক শিল্পকে নিয়ে আসছি। শিগগিরই আমরা কার্যক্রম শুরু করব।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে বাড়বে এ অঞ্চলের শিল্প কারখানা। বাড়বে বিনিয়োগ। সুযোগ সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। এরই মধ্যে বিভিন্ন শিল্প কারখানার মালিকরা জমি ক্রয় করেছেন।
বরিশাল বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের পণ্যবাহী ট্রাকগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আনা-নেয়ার সময় বিভিন্ন ফেরিঘাটে অনেক সময় দিনের পর দিন আটকে থাকত। যার জন্য আমাদের অনেক শিপমেন্ট বাতিল হতো। পদ্মা সেতুর দ্বার খুলে যাওয়ায় সেই ভোগান্তি আর থাকবে না।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. সাদেকুল আরিফিন বলেন, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষকে সারা দেশের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে এ সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, পদ্মা সেতু এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণ করবে। এনে দেবে অর্থনৈতিক মুক্তি।









