নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে ঋণদান প্রক্রিয়ার শুরুতেই। আমদানি পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভেড়ার প্রায় তিন মাস পর খোলা হয়েছে ঋণপত্র। সে ঋণের টাকা এখন আর পরিশোধ করছেন না গ্রাহক। শর্ত শিথিল করে সে ঋণ আবার বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবুও পরিশোধ হয়নি টাকা। উপরন্তু বন্ডেড ওয়্যারহাউজ থেকে মালামাল তুলে বিক্রিও করে দিয়েছেন গ্রাহক। এ ঘটনার জন্য গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং যে নথির বিপরীতে ঋণ নেয়া হয়েছিল, সেটি ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ আদেশ মানতে রাজি না হওয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তা বরখাস্তের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এ ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে কৃষি ব্যাংকের ষোলশহর শাখায়। অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, ২০১৩ সালের নভেম্বরে সিঙ্গাপুর থেকে তিন হাজার টন পাম অয়েল আমদানি করে এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। আমদানীকৃত ওই পাম অয়েলের জাহাজীকরণ হয় ২৩ নভেম্বর। জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় ২৯ নভেম্বর। এর তিন মাস পর ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আমদানির বিপরীতে কৃষি ব্যাংকের ষোলশহর শাখায় ঋণপত্র খোলা হয়।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের আমদানি প্রক্রিয়া ও জাহাজীকরণ সম্পন্ন করে বিল অব ল্যাডিংয়ের (পণ্য জাহাজীকরণের নথি বা বিএল) বিপরীতে খোলা ঋণপত্রে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। ব্যাংক খাতে এ ধরনের বিএলকে স্টেইল বিএল বা বাসি বিএল হিসেবে ডাকা হয়। মূলত জিটুজি আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে এ ধরনের বিএলে ঋণপত্র খোলা হয়। সরকারিভাবে হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে আমদানিকারক বা রফতানিকারকের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া নিয়ে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে স্টেইল বিএলের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা হলে তাতে শতভাগ ঝুঁকি থাকে।
এসএ অয়েলের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্টেইল বিএলের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলায় শুরুতেই ঝুঁকিতে পড়ে কৃষি ব্যাংকের বিনিয়োগ। আমদানি প্রক্রিয়ার শুরুতেই এ ধরনের অনিয়মের কারণে ঋণ আদায়ে ঝুঁকি থাকলেও সেটি আমলে নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এলটিআর ঋণের (লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট বা বিক্রি করে অর্থ পরিশোধ করা হবে এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেয়া ঋণ, এর ফলে জামানত হিসেবে রক্ষিত পণ্য নিজের কাছে রাখার সুযোগ পান গ্রাহক) টাকা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত না দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত ব্যাংকের দেয়া সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছেন এসএ অয়েলের স্বত্বাধিকারী শাহাবুদ্দিন আলম।
এ ঋণের গোটা প্রক্রিয়াতেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও একাধিক সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গিয়েছে, চট্টগ্রামে কৃষি ব্যাংকের ষোলশহর শাখায় গোটা প্রক্রিয়ায় আমদানি পণ্য জাহাজীকরণের প্রায় তিন মাস পর ঋণপত্র খোলা, আবেদনের প্রায় এক বছর পর ঋণের পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান, এলটিআর পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিমুক্ত শর্ত বাদ দেয়া, আগের খেলাপি গ্রাহককে জামানতহীনভাবে ঋণ প্রদান, ঢালাওভাবে একাধিক গ্রাহককে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সাল থেকে ঘটে যাওয়া এসব অনিয়মে ব্যাংকের তত্কালীন কর্মী ছাড়াও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, শাহাবুদ্দিন আলমের ক্ষেত্রে ঋণের টাকা ফেরত না আসার পরও এখনো একের পর এক নিয়মবহির্ভূত সুযোগ দেয়া অব্যাহত রেখেছে কৃষি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডের নামে কৃষি ব্যাংকে ওই আমদানির ঋণপত্র খোলা হয় ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ষোলশহর শাখায় খোলা ঋণপত্রের নম্বর ০৫১৩১৪০১০০০২। শর্ত ছিল, পণ্য আমদানির পর ঋণ পরিশোধ করে ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য জাহাজীকরণের নথি ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে হবে। শর্ত পূরণ না হওয়ায় ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ২৪ লাখ ৯০ হাজার ডলারের (বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ টাকা) ওই ঋণপত্রের বিপরীতে এসএ অয়েলের মালিক শাহাবুদ্দিন আলমের নামে একটি ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে বিদেশী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে কৃষি ব্যাংক। পণ্য দেশে আসার পর এখন পর্যন্ত (২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ) ওই পণ্য খালাসের বিএলসহ প্রয়োজনীয় নথি ব্যাংকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে। সুদসহ বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে আরো জানা যায়, আসল বিএল ছাড়াই বা ভুয়া বিএল তৈরির মাধ্যমে এসএ অয়েল কাস্টমসের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ থেকে পণ্য তুলে নিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ডেড ট্যাংক টার্মিনালে রক্ষিত মালামালের অবস্থা জানার জন্য কৃষি ব্যাংকের ষোলশহর শাখা কোনো তদন্ত চালায়নি। কৃষি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার এ অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি আমদানিকারক ও কাস্টমসের ভাড়া করা বন্ডেড ট্যাংক টার্মিনাল একই মালিকের হওয়ায় গ্রাহক সহজেই কাউকে না জানিয়েই পণ্য বিক্রি করে দিতে পেরেছে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ। আইন ও শর্ত অনুযায়ী ডাউনপেমেন্ট সঠিকভাবে না দিলেও প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দিয়েছে কৃষি ব্যাংক।
অন্যদিকে কৃষি ব্যাংক সূত্রে জানা গিয়েছে, বিআরপিডি-১৫ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় বিশেষ সুবিধা নিতে ব্যাংকে আবেদন করেছিলেন অভিযুক্ত গ্রাহক। এজন্য বিএল সংগ্রহ করে পণ্য খালাসের চাপ সৃষ্টির পরিবর্তে বিশেষ সুবিধায় ঋণ নিয়মিত করতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়। ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় প্রযোজ্য হারে ডাউন পেমেন্ট আদায় নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এখনো এসএ অয়েল কোনো কিস্তিই পরিশোধ করেনি। এর পরও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ খেলাপি গ্রাহকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ঋণদাতা শাখার কর্মীদের শাহাবুদ্দিন আলমের বিএল ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করার প্রয়াস চালানোর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি এসএ অয়েলকে বিএল প্রদান না করায় ষোলশহর শাখার ম্যানেজার রেজা মো. আলীকে বরখাস্ত করেছে কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। পাশাপাশি একই পদে বেশ কয়েকজনকে পদায়নের চেষ্টা করলেও এখন কেউই ওই শাখার দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না। সম্প্রতি ওই পদে একজন কর্মীকে দায়িত্ব দেয়া হলেও বদলি আদেশ পাওয়ার দুই সপ্তাহ পরও তিনি নতুন পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।
এসএ গ্রুপের খেলাপি ঋণ শর্ত শিথিল করে পুনঃতফসিল কার্যকর করার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপক রেজা মো. আলী বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে আমি সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় আছি। বিষয়টি তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
একই গ্রাহকের আগেও প্রায় ৮০ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। এর পরও পণ্য আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে গ্রাহককে। এর আগেও ব্যাংকে তার ৮০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ঋণ অনাদায়ী রয়েছে। তার পরও তাকে ফোর্সড লোনের ৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা (সুদসহ) এবং আগের ৮০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা যথাক্রমে বিআরপিডি-১৫ ও বিআরপিডি-৫-এর আওতায় পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়।
শাহাবুদ্দিন আলমকে ফোর্সড লোনের অর্থ নয়টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। এর আওতায় বিআরপিডি-১৫-এর ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট পরিশোধের কথা ছিল। সেটি এখনো পরিশোধ করেনি খেলাপি প্রতিষ্ঠান এসএ অয়েল লিমিটেড। ফলে পুনঃতফসিল সুবিধাটিও কার্যকর করা হয়নি।
২০১৯ সালের মে মাসে বিআরপিডি-৫-এর আওতায় মেসার্স এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড ও সামান্নাজ সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডের ৮০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার এলটিআর ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে ৩৮টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়া হয়। বর্তমানে সেটিও থমকে আছে।
কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতি ও জামানত ছাড়া অর্থ লোপাটের বিষয়ে এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে সম্প্রতি তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড, সামান্নাজ সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড ও মেসার্স রহমান ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও ১৫৮ দশমিক ৮৮ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল কাঙ্ক্ষিত নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২২ ফেব্রুয়ারি কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া এক পত্রে এ বিষয়ে কারণ ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ঘটনাটি প্রায় আট বছর আগের। ওই সময়ে কেন স্টেইল বিএলে ঋণপত্র খোলা হয়েছে, সেটি তত্কালীন কর্মকর্তারাই জানেন। এ গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সঠিক নয়। একজন গ্রাহক প্রায় এক দশক ধরে ব্যাংকের টাকা দিচ্ছেন না, টাকা আদায়ের স্বার্থে সুদ মওকুফ ছাড়া শুধু পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যা এখনো কার্যকর হয়নি।









