সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ সরকারের বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে। সরকারি বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তহবিলের বড় অংশও এ ব্যাংকে জমা থাকে। আবার সরকারি উদ্যোগে সিংহভাগ পণ্য আমদানিতেও থাকে মধ্যস্থতার ভূমিকায়। সরকারের এসব অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে মূলত সরকারের সঙ্গেই ব্যবসা করছে সোনালী ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ এ ব্যাংক রেকর্ড ৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। এর প্রধান উৎস ছিল সরকারি কোষাগার। সরকারের বিক্রি করা উচ্চ সুদের ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনে গত বছর ব্যাংকটি আয় করেছে ৯ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর আয় হয়েছিল ৬ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে ট্রেজারি বিল-বন্ড বা বিনিয়োগ থেকে এক বছরে ব্যাংকটির আয় ৩ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে যে সুদ আয় সাধারণত ব্যাংকগুলোর মূল আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত, সে খাতে সোনালী ব্যাংকের আয় কমেছে। ২০২৪ সালে ঋণ বিতরণ থেকে ব্যাংকটির সুদ আয় ছিল ৭ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যা গত বছর কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সোনালী ব্যাংকের রেকর্ড পরিচালন মুনাফার পেছনে সরকারি কোষাগারই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। কারণ স্বল্প সুদের আমানত দিয়ে ব্যাংকটি ১০-১৩ শতাংশ সুদের সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনেছে।
ব্যাংকটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে জমাকৃত আমানতের বেশির ভাগই সরকারি খাতের। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জমাকৃত আমানতের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৮০৩ কোটি টাকার বিপরীতে কোনো সুদ নেই (বিনা সুদের)। আরো ৯৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা আমানতের সুদহার খুবই কম। সে হিসাবে ব্যাংকটির মোট আমানতের ৭০ শতাংশেরও বেশির সুদহার খুবই স্বল্প। সুদহার বেশি এমন আমানতের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট আমানতের মাত্র ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি খাতের বৃহত্তম ব্যাংক হওয়ায় আমানত সংগ্রহে ব্যাংকটির কর্মীদের তেমন কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। বরং বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ থেকে শুরু করে সরকারি অর্থ এমনিতেই সোনালী ব্যাংকে জমা হয়। জমাকৃত এ অর্থ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে ব্যাংকটি এখন অনেকটাই ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনায় ঝুঁকে পড়েছে। আর স্বল্প সুদের আমানত দিয়ে উচ্চ সুদের সরকারি সিকিউরিটিজ কিনে যে মুনাফা হচ্ছে, সেটিকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তারা নিজেদের সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন।
রেকর্ড পরিচালন মুনাফা অর্জনের বিষয়টি জানাতে গতকাল সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর সুশাসনের ফলে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। গত বছর খেলাপি ঋণ কমেছে। খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায় অনেক বেড়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর হয়েছি। আদায় জোরদার করার পাশাপাশি এসএমই খাতে ঋণ দেয়া হচ্ছে। আমানত সংগ্রহে এখন খুব বেশি বেগ পেতে হচ্ছে না।’
অবশ্য সোনালী ব্যাংক এমডির এ বক্তব্যের খুব বেশি প্রতিফলন আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর দেশের বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। আর এক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল গড় প্রবৃদ্ধিরও নিচে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিমের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অথচ গত বছর আমানতের ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংক ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার এত বেশি না হলে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি না হয়ে উল্টো কমে যেত।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে তিন বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য নীতি সুদহার ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আর নীতি সুদহার দ্বিগুণ করার প্রভাবে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। একই সঙ্গে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার উঠেছে ১০-১৩ শতাংশে। উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারকে ঋণ দিচ্ছে।
সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বছর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার কমেছে। ২০২৪ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ১৮ শতাংশের বেশি খেলাপি থাকলেও এখন তা ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপির পরিমাণ ১৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। তবে গত বছর শেষে ব্যাংকটি ৮৩ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় সোনালী ব্যাংকের এ চিত্র অনেকটাই ভালো।
২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। ওই টাকা এখনো আদায় করতে পারেনি ব্যাংকটি। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে সোনালী ব্যাংক এমডি শওকত আলী খান জানান, ‘গত বছর হলমার্ক গ্রুপের কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। বাকি টাকা আদায়ে গ্রুপটির জমি, কারখানা ও যন্ত্রপাতি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। এক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগকারী নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। হলমার্কের ঘটনা সোনালী ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। এরপর এমন আর কোনো ঘটনা এখানে ঘটেনি।’
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনার মাধ্যমে রেকর্ড মুনাফার বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সফলভাবে ট্রেজারি ব্যবস্থাপনাও ব্যাংকের সাফল্যের অংশ। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় দেশের অন্য ব্যাংকগুলোও ট্রেজারি বিল-বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে। তবে আমি গতকালই ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের সারা দেশ ঘুরে বেড়াতে বলেছি। এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বলেছি। আশা করছি, চলতি বছর এসব খাতে ঋণ বাড়বে।’










