বেলা ১১টার মধ্যে ইমিগ্রেশনে পৌঁছা জরুরি। নির্ধারিত ফ্লাইট ছেড়ে যাবে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনায় পৌঁছতেই স্তব্ধ হয়ে গেল সব হিসাব-নিকাশ।

মহাসড়কে মাইলের পর মাইলজুড়ে স্থবির হয়ে আছে যানবাহন। চোখের সামনে নেমে এল ঘোর অন্ধকার। যানজটের যে ভয়াবহ রূপ, তাতে বিকালের আগে ঢাকা পৌঁছা অসম্ভব। একদিকে প্রবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আর টিকটিক করে চলা সময়, অন্যদিকে মহাসড়কের নিশ্চল বন্দিদশা।

এমন কঠিন সংকট মুহূর্তে চরম বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিলেন সাইফুল। প্রাইভেট কারে বোন ছালেয়া, নাতনি ফাইজা ও স্ত্রী কোহিনূর আকতারকে রেখে দিলেন। গাড়ি ও বড় লাগেজ নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। সঙ্গে রাখা বড় কার্টনটি গাড়িতেই রেখে দিলেন। শুধু একটি কাঁধের ব্যাগ নিয়ে মহাসড়কে সোজা হাঁটা শুরু করলেন সাইফুল।

শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য দৌড়। মহাসড়কের জ্যাম এড়াতে একের পর এক বাহন পরিবর্তন করতে থাকেন তিনি। মহাসড়কের জ্যাম এড়াতে তিনি প্রথমে চান্দিনা থেকে ৫০০ টাকায় ব্যাটারি রিকশায় যান ইলিয়টগঞ্জ। এরপর ইলিয়টগঞ্জ থেকে ১ হাজার টাকা ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পৌঁছান দাউদকান্দি। ১০০ টাকায় ব্যাটারি রিকশায় দাউদকান্দি ব্রিজ পার হয়ে ব্রিজের ওপার থেকে ৪০০ টাকায় সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যান ভবের চর। সেখান থেকে পুনরায় ১ হাজার টাকায় সিএনজিযোগে মেঘনা টোল প্লাজায়, সেখান থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার সিএনজি অটোরিকশা রাইডে পৌঁছান গাউছিয়া। পরে গাউছিয়া থেকে ৪০০ টাকায় দ্রুতগতির সিএনজি অটোরিকশায় ৩০০ ফিট গিয়ে শেষ মুহূর্তে দুটি মোটরসাইকেলে ৭০০ টাকা ভাড়ায় সরাসরি বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন তিনি।

মোট ৫ হাজার ৬০০ টাকা খরচ ও ছয়টি বিকল্প বাহন বদলে বেলা ১টা ১০ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছান সাইফুল। তখন ইমিগ্রেশনের দরজা প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। নির্ধারিত ফ্লাইটের ঠিক আগে তার মুখে ফোটে স্বস্তির হাসি। অভিজ্ঞতার কথা নিজেই জানান এ প্রতিবেদককে।

এ মহাসড়কে প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকার খবর দীর্ঘদিনের। জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনা, সড়ক সংস্কার ও শ্রমিক অসন্তোষ এর অন্যতম কারণ। যানজটে সবচেয়ে বেশি নাকাল হচ্ছেন কুমিল্লার বাসিন্দারা। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া যানজট গতকাল সকাল পর্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে।

এ যানজটে আটকে থেকে অ্যাম্বুলেন্সে মারা গেছেন আমিরুন্নেছা নামের এক বৃদ্ধা। তিনি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের বাসিন্দা। তার স্বজন আবুল হাসান জানান, গত শুক্রবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাত ১১টায় দাউদকান্দিতে যানজটে আটকে যায় অ্যাম্বুলেন্স। ৪ ঘণ্টা আটকে থাকার পর রাত ৩টার দিকে তিনি মারা যান।

সোনারগাঁর আশরিয়ারচর থেকে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার জুড়ে এ যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনে যানজট কমলেও ধীরগতিতে গাড়ি চলছিল।

সোনারগাঁর আশরিয়ারচরে ঢাকাগামী লেনে গত শুক্রবার সকালে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার কারণে এ যানজটের সৃষ্টি হয় বলে জানান কুমিল্লা হাইওয়ে রিজিয়ন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান।

কুমিল্লা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মোস্তফা বণিক বার্তাকে জানান, আশরিয়ারচর ব্রিজ এলাকায় ঢাকা অভিমুখী লেনের একটি অংশে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। দিন দিন গর্তটি বড় হয়ে ওঠায় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সেখানে সংস্কারকাজ শুরু করা হয়। কাজ চলাকালে মহাসড়কের দুই লেনের একটি বন্ধ রেখে অন্য লেন দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। এতে ধীরে ধীরে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে ও একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। রাতেও যানজট ছিল।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ওসি প্রেম দাস রায় বলেন, ‘সড়ক সংস্কারের জন্য মহাসড়কের একটি লেন বন্ধ থাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তবে যানজট স্থায়ী হচ্ছে না, ধীরগতিতে গাড়ি চলাচল করছে।’