সামুদ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পটির (এসসিএমএফ) মেয়াদ সাত মাস বাকি থাকলেও ৭৫ শতাংশ কাজই শেষ হয়নি। আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার সম্ভাবনা না থাকায় আরো দুই বছরের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে ডিপিপি প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। নতুন করে দুই বছর সময় বাড়ালেও বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে কিনা সে বিষয়ে নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যেহেতু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটির কাজ চলমান। সে কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে অর্থায়ন ছাড় নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংক যেখানে বিনিয়োগ করে সেখানে নানা ধরনের শর্ত থাকে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। যে কারণে সময়সীমা বাড়ছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের টাকা ব্যবহার না করা গেলেও নির্দিষ্ট সময়ের  মধ্যেই সুদ পরিশোধ করতে হবে। এতে ক্ষতি হবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২২১ মিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকার ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প’ (এসসিএমএফ) একনেকে পাস হয় ২০১৮ সালে। প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংক ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এদিকে প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার কারণে চলতি বছরের জুলাইয়ে সংশোধিত ডিপিপি করে আরো দুই বছর সময় বাড়াতে একনেকে আবেদন করা হয়েছে। তবে ডিপিপিতে ব্যয় বাড়ানো হয়নি বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প পরিচালক ড. আলীম বণিক বার্তাকে বলেন, মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশের কিছু বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিস্তারিত বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি তা বলতে অস্বীকার করেন।

কর্মকর্তারা জানান, সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পটির মেয়াদ (এসসিএসএফ) ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৯ সালের মে মাসে। কভিডসংক্রান্ত জটিলতা না থাকলেও প্রকল্পটির কাজ পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। প্রায় সাড়ে ১৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি শুরু থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই ভালোভাবে করা হয়নি। যার কারণে প্রকল্পটির শুরুর দিকে কাজ গুছিয়ে আনতেই অনেক সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এদিকে কভিডের অজুহাত তুলে এরই মধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়াতে একনেকে নতুন ডিপিপি উপস্থাপনা করেছে। এমনটাও হতে পারে এক দফা সময় বাড়ানোর পর নতুন করে আবারো সময় বাড়ানোর আবেদন করা হতে পারে।

প্রকল্পটির উপপ্রকল্প পরিচালক অধীর চন্দ্র দাস বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটির অগ্রগতি শুরু থেকে ভালো হলেও কভিডের কারণে আমাদের প্রায় দেড় বছর প্রকল্পটির অগ্রগতি কম হয়েছে। আমরা এখন অবকাঠামো নির্মাণসহ খাল খননকাজ শেষ করেছি। তাছাড়া অনেক জায়গায় জমি অধিগ্রহণ করা, বিশ্বব্যাংকের ফান্ড পাওয়া নিয়ে জটিলতার কারণে কাজে ধীরগতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে প্রকল্পের কাজের ৭০ শতাংশ সম্পন্ন করা যেত।

পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ চার ভাগে করা হচ্ছে। প্রকল্পটি চট্টগ্রাম, খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের ১৬টি জেলা এবং এসব জেলার ৭৫টি উপজেলা এবং ৭৫০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রথম ভাগে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুদ নির্ণয় এবং জাতীয় ফিশারিজ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হবে। এছাড়া ১০০টি বাণিজ্যিক ট্রলার এবং ১০ হাজার যান্ত্রিক নৌকায় জিপিএস ট্রাকার লাগানো হবে। চিংড়ি উৎপাদনে ক্লাস্টার ব্যবস্থা চালুকরাসহ প্রান্তিক চাষীদের (৬০০টি ক্লাস্টারের) চিংড়ি চাষে নতুন পদ্ধতিতে আনয়নসহ গড়ে ২০ শতাংশ বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করা হবে।

দ্বিতীয় ভাগে সমুদ্রতীরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক সম্পদের উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পের এ ভাগে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৬টি করে মেরিন ফিশারিজ সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট নির্মাণ ও সার্ভিলেন্স প্লাটুুন স্থাপন, ১৮টি ফিশ লান্ডিং সেন্টার ও ফিশ মার্কেট নির্মাণ করা হবে। সমুদ্রে যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ, ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা মাছ ধরতে যাবে সেগুলো এখানে রিপোর্ট দেবে। এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালে তিনটি করে কোয়ারেন্টাইন ল্যাব, ডায়াগনস্টিক ল্যাব, পিসিআর ল্যাব আধুনিকায়নসহ ১২৯টি উপকূলীয় খাল খনন করা হচ্ছে। তাছাড়া সমুদ্রে যে জাহাজ বা নৌকাগুলো মাছ ধরার উদ্দেশ্যে যাবে সেগুলোতে ট্র্যাকিং সিস্টেম থাকবে। এতে করে সমুদ্রে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তৃতীয় ভাগে মৎস্যজীবীদের বিকল্প পেশায় রূপান্তরে কাজ করা, উপকূলীয় ৪৫০টি মৎস্য গ্রামে কমিউনিটি সেভিংস গ্রুপ প্রতিষ্ঠা, ১০০টি মডেল গ্রাম এবং ৬০ শতাংশ সুবিধাভোগীদের অর্থ সহায়তা করা হবে। এছাড়া মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ১০০টি প্রডিউসর গ্রুপ তৈরি, যুব উন্নয়ন প্রোগ্রাম, উপজেলা জেলে ফেডারেশন প্রতিষ্ঠাসহ সর্বমোট ৫৪ হাজার জেলেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা দেয়া হবে। চতুর্থ ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োগ ছাড়াও কারিগরি সহায়তার জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করার কাজ চলছে।

প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক হাসান আহম্মেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটির জন্য নতুন ডিপিপির মাধ্যমে ২ বছর কাজের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন একনেকে জমা দেয়া হয়েছে। প্রকল্প পাসের পর বিশ্বব্যাংক যেসব শর্ত দিয়েছে সেগুলো মেনে কাজ করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের।