রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গুরুতর ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হন ৫২ বছর বয়সী আলামিন হোসেন। দীর্ঘ এক সপ্তাহ নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর গত ৩০ অক্টোবর তিনি মারা যান। তার কেস স্টাডি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গুরুতর ডেঙ্গু সংক্রমণের কারণে লিভার ও কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে মস্তিষ্কের প্রদাহের ঘটনা বেশি দেখা দিয়েছে। এতে রোগটির চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ শুধু রক্ত ও রক্তনালিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে এ ভাইরাস মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। যদিও ডেঙ্গুতে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা তুলনামূলক বিরল। তবে এ বছর এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রভাবে মস্তিষ্কে প্রদাহ, স্নায়ুকোষের ক্ষতি, খিঁচুনি এমনকি চেতনা হারানোর মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর বারিধারার মাদানী হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রদাহকে এনসেফালাইটিস বলা হয়। ডেঙ্গুতে এ ধরনের প্রদাহ তৈরির একটি কারণ হলো ভাইরাসের সরাসরি মস্তিষ্কে প্রবেশ। আরেকটি কারণ হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া। সাধারণত মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয় রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক নামের একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এটি রক্ত থেকে ক্ষতিকর অনেক উপাদানকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ডেঙ্গু সংক্রমণের সময় ভাইরাস ও প্রদাহ সৃষ্টিকারী কিছু উপাদান এ সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস বা রোগ প্রতিরোধক কোষের উপাদান মস্তিষ্কে পৌঁছার সুযোগ তৈরি হয়। এ বছর আমরা প্রতি সপ্তাহেই এ ধরনের দুই-তিনজন করে রোগী পাচ্ছি, যেটা আগে খুব পাওয়া যেত না বললেই চলে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরির এ প্রক্রিয়ায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীর সাইটোকাইন নামের কিছু সংকেতবাহী প্রোটিন নিঃসরণ করে। এগুলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করলেও প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া অতিরিক্ত হলে রক্তনালির কোষ ও আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। ডেঙ্গুতে মস্তিষ্কের প্রদাহ তৈরির পেছনে এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে।’
ডেঙ্গুর প্রভাবে মস্তিষ্কের প্রদাহের বিষয়টি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু সাইদ শিমুলের পর্যবেক্ষণেও এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু এ বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে, যার কারণে নতুন নতুন জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে মস্তিষ্কে প্রদাহের ঘটনা এখন আমরা পাচ্ছি। এসব কারণে ডেঙ্গুর চিকিৎসাও জটিল হয়ে যাচ্ছে।’
সম্প্রতি ডেঙ্গু থেকে সেরে উঠেছেন ষাটোর্ধ্ব হালিমা খাতুন। তিনিও একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে এসেছেন। ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর তিনি বেশকিছু জটিলতায় ভুগছেন। বিশেষ করে তার অলসতা, ঘুম ঘুম ভাব আর সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা ও বমি ভাব দেখা দিয়েছে। তার এ উপসর্গকে ডাক্তারদের ভাষায় বলা হয় পোস্ট-ভাইরাল ফ্যাটিক সিনড্রোম। এক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত কারণে রোগীর মস্তিষ্কে যদি কোনো প্রদাহ তৈরি হয় তাহলে তার মৃদু থেকে তীব্র কিছু উপসর্গ দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডেঙ্গুজনিত কারণে মস্তিষ্কের কোনো টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সারতে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনো কখনো ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে ভর্তি থাকতে হয়। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় যাওয়ার পরও অন্তত ছয় মাস বিভিন্ন উপসর্গে ভুগতে হয়। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ রোগী স্মৃতিভ্রষ্টতায় ভোগে। তাছাড়া তাদের কাজকর্ম ও চলাফেলা ধীরস্থির হয়ে যায় বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা সবচেয়ে দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে জ্বর কমে যাওয়ার পর। প্লাটিলেট কমার পাশাপাশি রক্তনালির ভেতর থেকে প্লাজমার তরল অংশ বেরিয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় শুরু হয়। এ সময়ে ভাইরাস ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে রক্তে প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে, যা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এর চেয়েও মারাত্মক সমস্যা হলো প্লাজমা লিকেজ। রক্তনালি থেকে তরল অংশ বের হয়ে রক্ত ঘন হয়ে যায় এবং পেটে বা ফুসফুসে পানি জমে। এতে রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে রোগী ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে চলে যেতে পারেন। এ সময়ে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়ায় অনেক রোগী কিংবা স্বজন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসা এবং আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।’
ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নতুন নতুন উপসর্গ যোগ হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা (পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি) ঘোষণার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি থেকেই বোঝা যায়, রোগটির ক্ষতি করার সক্ষমতা বেড়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাস মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছলে তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এতে মৃত্যু সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ডেঙ্গুর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এ বিশেষজ্ঞ।










