চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ৬৮ বছর বয়সী তৈয়ব আলী দীর্ঘ ৩২ বছর সরকারি চাকরি করেছেন। ২০১৯ সালে অবসরে যান তিনি। অবসরের পর কয়েক বছর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকলেও দেড় বছর আগে তাকে একটি প্রবীণ পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়। পাঁচ ছেলেমেয়ের সবাই চাকরিজীবী। তারা মাসে এক-দুবার বাবাকে দেখতে আসেন এবং কিছু টাকা দিয়ে যান। সেই অর্থেই পুনর্বাসন কেন্দ্রের খরচসহ তার অন্যান্য প্রয়োজন মেটে। তবে বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক অসুস্থতায় কঠিন সময় কাটছে তৈয়ব আলীর। চোখের দৃষ্টিশক্তিও কমে এসেছে।
তৈয়ব আলীর মতো দেশের অনেক প্রবীণের শেষ আশ্রয় হচ্ছে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র বা বৃদ্ধাশ্রম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় অনেকে একপর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে এ সংখ্যা আরো দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জনসংখ্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। গ্লোবাল এজওয়াচ ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছবে, সংখ্যায় যা প্রায় আড়াই কোটি।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার এ প্রেক্ষাপটে আজ ১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রবীণ দিবস। প্রবীণদের অবদানের স্বীকৃতি, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যকে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দ্য এজ অব লংজেভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’।
তিন দশক ধরে জনমিতিক লভ্যাংশের (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই কর্মক্ষম। ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১১ কোটি ৪২ লাখ বা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম। অন্যদিকে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ১০ জনে প্রায় একজন প্রবীণ। তবে আগামী বছরগুলোয় এ অনুপাত দ্রুত বদলে যাবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪-এ প্রবীণ হিসেবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের হিসাব করা হয়েছে।
ওই হিসাবে ২০২৪ সালে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার ছিল ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। ইউএনএফপিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার ১৩ শতাংশ ছাড়াবে।
ইউনিসেফের ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘পেয়িং ফরওয়ার্ড অ্যান্ড ইনভেস্টিং ইন চিলড্রেন নাউ: ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জেস ইন বাংলাদেশ—ট্রেন্ডস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালে বাংলাদেশ ‘এইজিং সোসাইটি’ বা বয়স্ক সমাজে প্রবেশ করবে। ওই বছর দেশে ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর হার ৭ শতাংশে পৌঁছবে। ২০৪৭ সালে এ হার বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়াবে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর অনুপাত দ্বিগুণ হবে। অন্যদিকে সরকারের সোশ্যাল সিকিউরিটি পলিসি সাপোর্ট কর্মসূচির এক প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১২ লাখে পৌঁছবে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে চললেও তাদের আবাসন ও সেবায় সরকারি প্রস্তুতি এখনো সীমিত। সরকার আটটি প্রবীণ নিবাস নির্মাণ করলেও সেগুলো এখনো চালু হয়নি। ফলে সরকারিভাবে কার্যকর কোনো বৃদ্ধাশ্রমও নেই।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, সাত বিভাগে সাতটি, জেলায় ৫৬টি, উপজেলায় ২৭টি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে দুটি মিলিয়ে মোট ৯২টি প্রবীণ নিবাস বা বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কতজন প্রবীণ বসবাস করছেন, তার সমন্বিত হিসাব সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই নেই। এর বাইরে বেসরকারিভাবে আরো কিছু প্রবীণ নিবাস রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মোশাররফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারিভাবে আটটি বিভাগে প্রবীণ নিবাস থাকলেও সেগুলো চালু করা যায়নি। আগামী মাসে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে অনেক বৃদ্ধাশ্রম আছে। বয়স্কদের জন্য আমরা বয়স্ক ভাতাই দিচ্ছি।’
দেশে প্রবীণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে বার্ধক্যজনিত শারীরিক ও মানসিক জটিলতাও। দেশের কয়েকটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের ‘প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক সমস্যার ব্যাপকতা, ধরন, সংশ্লিষ্ট কারণ ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি—একটি দেশব্যাপী খানাভিত্তিক জরিপ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবীণদের ২৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। নারীদের মধ্যে এ হার ৩১ দশমিক ৩ এবং পুরুষদের ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে বিষণ্নতায় ভুগছেন ১১ দশমিক ৬, উদ্বেগজনিত রোগে ৪ দশমিক ৮, সোমাটিক সিম্পটম ডিজঅর্ডারে ৩ দশমিক ৮ এবং নিউরোকগনিটিভ সমস্যায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে এ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপ্রতুল।
একাকিত্ব ও দুশ্চিন্তার কারণে প্রবীণদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক জটিলতা বাড়ছে বলে মনে করেন শৈলান প্রবীণ নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা দিলরুবা কবির। তিনি বলেন, ‘একাকিত্ব ও দুশ্চিন্তা থেকে প্রবীণদের নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রবীণ নিবাসে আসা অনেকের মধ্যেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তাই বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারিভাবেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের জন্য আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।’
দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ থাকলেও এর পুরো সুফল কাজে লাগানো যায়নি। কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দক্ষতার অভাব এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের দীর্ঘদিন বেকার বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকায় মানবসম্পদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতিও এর অন্যতম কারণ। এ অবস্থায় প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরো বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হারও বাড়বে। তাই তাদের শুধু নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখে সুস্থ, সক্রিয় ও যতটা সম্ভব উৎপাদনশীল রাখতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো, বিশেষ করে জেরিয়াট্রিক কেয়ার বা প্রবীণদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশনের আওতা সম্প্রসারণ জরুরি। শুধু আয়ু বাড়লেই হবে না, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়ও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের কর্মক্ষম রাখতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতা খাপ খাওয়াতে প্রয়োজনীয় নীতি নিতে হবে। তাহলে তারাও পরিবার ও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।’
সরকার বর্তমানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী দুস্থ ব্যক্তিদের বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচি ধাপে ধাপে সর্বজনীন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক প্রবীণকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা থাকবে। দেশের ৮৫টি শিশু পরিবারের খালি আসনেও প্রবীণদের থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে তাদের জন্য আলাদা আবাসন ও সেবা ব্যবস্থা আরো বাড়াতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসার চাহিদাও বাড়ে, তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বয়স্ক ভাতার আওতা ও বরাদ্দও ধীরে ধীরে বাড়ছে। ভাতাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৭ লাখ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মানুষের চাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ কর্মসূচির আওতা আরো বাড়ানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।’










