রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনে ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে পুলিশ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল সকালে কয়েক দফা সংঘর্ষের মধ্যে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। ভাংচুর করা হয় একটি ভেকু, পুলিশের গাড়ি, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের পুলিশ বক্স ও একটি বেসরকারি টিভির গাড়ি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দুজন গণমাধ্যমকর্মী।

ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযানে দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগ করেননি। ফলে সেখানে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল।’ বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও হকারদের দাবি, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোপ মার্কেট এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে হকার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পশ্চিম পাশের নিচতলায়ও আগুন দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ১৫-২০ মিনিট চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে হকারদের একটি অংশ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকালে হকার উচ্ছেদের সময় একটি ভবনে বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তখন ঘটনাস্থলে থাকা হকাররা সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাংচুর করেন। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। পুলিশের ওপর হামলা ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি ভাংচুরসহ একাধিক ঘটনায় অন্তত ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বেলা আড়াইটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ফের অভিযান শুরু হয়। দ্বিতীয় দফায় হোপ মার্কেটের উল্টো দিক থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রম চালানো হয়।

7

ফুটপাতের ওপর স্থাপিত কাঠের দোকানগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। সরিয়ে নেয়া হয় দোকানের কাঠ, টিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও এসআরবি সদস্য উপস্থিত ছিলেন। অভিযানে ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীও উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, ‘নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। মিরপুরের সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চায়। যারা অরাজকতার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পাশাপাশি ডিএনসিসির পক্ষ থেকেও মামলা করা হবে এবং তদন্ত করে গ্রেফতার করা হবে। ফ্যাসিজমের আমল থেকে ফুটপাত দখল করে রাখা ব্যক্তি ও তাদের ইন্ধনদাতারা দায়ী। সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে মসজিদে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়।’

তবে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। গতকাল বেলা ৩টার দিকে ভ্যারিফায়েড ফেসবুকে দেয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। এ বিষয়ে তারও দায়িত্ব রয়েছে, তাই তাকে সম্পৃক্ত করা যেত। পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে কার্যকর সমাধান সম্ভব ছিল। উচ্ছেদের আগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচলও নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। তার দাবি, মাসের পর মাস ধরে একদল অসাধু ব্যক্তি ও চাঁদাবাজ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা নিয়ে সেখানে ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর পড়ে।

দফায় দফায় সংঘর্ষের মধ্যে মিরপুর-১০ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলে হকাররা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে।’