আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আজ শনিবার গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ব্র্যাক-সিডিএম-এ বিচারক, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘অ্যাক্সেলারেটিং ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের দু’দিনব্যাপী সমন্বয় সভার উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা মানবাধিকার নিশ্চিত করারই অংশ। প্রত্যেক মানুষের কিছু অবিচ্ছেদ্য, সহজাত ও সার্বজনীন অধিকার রয়েছে। নাগরিকরা যাতে এসব অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার শুধু কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল লক্ষ্য প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও নিশ্চিত করা। এমনকি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, বিচারককে শুধু আইনের কালো অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মামলার বাস্তবতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে আইনের ব্যাখ্যা করতে হবে। বিচারিক কর্মকর্তাদের সর্বোপরি জনগণের সেবা করতে হবে।
যেসব লিগ্যাল এইড অফিসার আইনগত সহায়তা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অসাধারণ ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখবেন, তাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগ থেকে একজন সেরা অফিসারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া সারাদেশের ২০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার অসাধারণ ও অনুকরণীয় কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এ ধরনের স্বীকৃতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মসম্পাদনে উৎসাহ বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদানের বিষয় বিবেচনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে আইনি সহায়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আবেদন গ্রহণ, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ আরো সহজ করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ বিচারাধীন মামলা রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল হোসাইনের সভাপতিত্বে সভায় ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র রুল অব ল’ জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বক্তব্য দেন।
আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল আইনি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া। এ লক্ষ্যে নয়টি জেলায় ৫৭টি উপজেলা লিগ্যাল এইড কমিটি এবং ৪১৩টি ইউনিয়ন লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম আরো কার্যকর ও সমন্বিত করার আলোচনা হচ্ছে।
জেলাগুলো হলো-রাজবাড়ী, হবিগঞ্জ, বরগুনা, নেত্রকোনা, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঝিনাইদহ, খাগড়াছড়ি ও বগুড়া। এসব কমিটিকে তৃণমূল পর্যায়ে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহজে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পান।
সভায় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে অনলাইন বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং মধ্যস্থতার সঙ্গে ডিজিটাল আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়। এর পাশাপাশি, ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সিস্টেমের নকশা, উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলও উপস্থাপন করা হয়।










