দেশে স্মার্ট ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে আবাসন উন্নয়নের পাশাপাশি জ্বালানি নিয়েও পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তুললেই স্মার্ট শহর হবে না। মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, চলাচল, নিরাপত্তা, জ্বালানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নিয়ে নগর পরিকল্পনা করতে হবে। বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ কথা বলেন। রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলে গতকাল এ নীতি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

সবুজ আবাসন যেন বিলাসপণ্য না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ রাখার তাগিদ দিয়ে এবিসি রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রাবন্তী দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশে সবুজ আবাসনকে এখন আর শুধু বিপণনের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, জমির সংকট ও জ্বালানি সংকটের বাস্তবতায় সবুজ আবাসনকে সাশ্রয়ী রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ ভবন নির্মাণের নামে অতিরিক্ত প্রযুক্তি, সেন্সর ও ব্যয়বহুল ব্যবস্থা যুক্ত করলে এ ধরনের আবাসন বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত হবে। এতে যাদের পরিবেশগত ঝুঁকি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি, তারাই এ আবাসন কিনতে পারবেন না। তাই সবুজ আবাসনের ব্যয় ও সুবিধার মধ্যে তৈরি করতে হবে ভারসাম্য। একই সঙ্গে ভবনের মান, নিয়ম মেনে চলা, সনদ প্রদান ও তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।’

আগে জ্বালানি পরিকল্পনা করে তারপর উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ে জোর দিয়ে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘একসময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে—এটিকে স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে মনে করা হতো। এখন জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। তাই কোনো খাত বা নতুন আবাসিক এলাকা উন্নয়নের আগে জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা করা জরুরি। নতুন শহর বা আবাসিক এলাকা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে এলপিজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কেন্দ্রীয় এলপিজি স্টোরেজ স্থাপন করে সেখান থেকে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেয়া হলে ভবনের বিভিন্ন তলায় সিলিন্ডার বহনের প্রয়োজন হবে না। এ ধরনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও নীতিমালা করা দরকার।’

স্বতন্ত্র বাড়িগুলোয় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা এবং বিদ্যমান মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সুবিধা বাসিন্দাদের মধ্যে বণ্টনেরও পরামর্শ দেন তিনি। ভবিষ্যতের আবাসন পরিকল্পনায় জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ এলপিজি সরবরাহ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন আজম জে চৌধুরী।

ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে নগরায়ণকে বিকেন্দ্রীকরণ করার পরামর্শ দেন গ্লাস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জিএমইবি) প্রেসিডেন্ট ও নাসির সিনটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘নির্মাণ খাতে গ্লাসের ব্যবহার বাড়ালে ভবনে প্রাকৃতিক আলোর প্রবেশ বাড়বে। এতে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার কমার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় হবে। দেশে এখন ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। পাশাপাশি লো-ই গ্লাস, সোলার গ্লাস ও ডাবল-গ্লেজড গ্লাসের উৎপাদনও শুরু হচ্ছে। ডাবল-গ্লেজড গ্লাস ব্যবহারের মাধ্যমে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে গরমকালে বাইরের তাপ ভেতরে প্রবেশ কমবে এবং শীতকালে ভেতরের তাপ ধরে রাখা যাবে। ফলে এয়ার কন্ডিশনিং ও হিটিং ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।’

ঢাকার উচ্চ জনঘনত্বের বিষয়টি তুলে ধরে নাসিম বিশ্বাস বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় দুই-তিন হাজার মানুষ ঢাকায় আসছে। বছরে এ সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। ফলে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে নগরায়ণকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। অন্য শহরগুলোর দিকে মনোযোগ বাড়ানো গেলে ঢাকার জনসংখ্যা ও নগর ব্যবস্থাপনার চাপ কমানো সম্ভব।’

সরকারি জমি ব্যবহার করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরির প্রস্তাব দেন আবাসন খাতে অর্থায়নকারী ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক কোম্পানি (এনবিএফসি) ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিমুল বাতেন। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই একটি শহর স্মার্ট হয়ে যায় না। শহরের বাসিন্দাদের ব্যয় সাশ্রয়, দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো তৈরি হলেও সামগ্রিক যানজট, জলাবদ্ধতা ও আবাসন সংকট এখনো বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। তাদের একটি বড় অংশ বস্তিতে বসবাস করছেন। ফলে আবাসনকে সাশ্রয়ী করার বিষয়টি স্মার্ট নগরায়ণের অন্যতম প্রধান শর্ত।’

নাসিমুল বাতেনের মতে, আবাসন খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সামর্থ্যের ঘাটতি। মানুষের আয়ের তুলনায় বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে মর্টগেজ-জিডিপি অনুপাত একসময় ৩ শতাংশ থাকলেও এখন তা ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। অথচ ভারতে ২০১০ সালে এটি ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও এখন প্রায় ১২-১৩ শতাংশ। সেখানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, রিফাইন্যান্স ও সুদে ভর্তুকির মতো উদ্যোগ কাজে দিয়েছে।

ডেভেলপারদের প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ ভূমি অধিগ্রহণে চলে যায় উল্লেখ করে নাসিমুল বাতেন আরো বলেন, ‘সরকারি জমি এ ধরনের প্রকল্পে ব্যবহার করা গেলে এতে সরকার ৩০-৩৫ শতাংশ ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবে, যা সরকারি কর্মীদের জন্য ভাড়া বা বিক্রি করা যাবে। বাকি অংশের নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় প্রতি বর্গফুট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় ডেভেলপাররা বিক্রি করতে পারবে, ফলে ৬০০ থেকে ১ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম ২৪ লাখ থেকে ৩৫-৪০ লাখ টাকার মধ্যে থাকবে। ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়া গেলে এবং সুদহার ৭-৮ শতাংশে রাখতে পারলে ২০ লাখ টাকার ঋণের কিস্তি মাসে ১৫ হাজার টাকার নিচে থাকবে। দেশে আবাসন খাতের জন্য কেন্দ্রীর ব্যাংকের ৭০০ কোটি টাকার একমাত্র পুনঃঅর্থায়ন স্কিমটি ২০০৭ সালে চালু হয়ে ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এ স্কিম থেকে ডিবিএইচ ৪৮০ কোটি টাকা নিয়েছিল। সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য এ ধরনের স্কিম থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সবুজ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রণোদনা প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ, উন্নত বায়ু চলাচল, ভবনের সঠিক নকশা, কম পানি ব্যবহারের সরঞ্জাম, এলইডি বাতি ও বিএলডিসি ফ্যানের মতো ব্যবস্থা ব্যবহার করলে নির্মাণ ব্যয় সামান্য বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমবে।’

ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) প্রেসিডেন্ট এবং ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। ‘নির্মাণে দেশীয় সক্ষমতা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্মাণ খাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। পুরনো প্রযুক্তিতে প্রতি টন সিমেন্ট উৎপাদনে ৪৫-৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও নতুন প্রযুক্তিতে তা ২৮-৩০ কিলোওয়াটে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে রড উৎপাদনে পুরনো প্রযুক্তিতে যেখানে ৬০০-৭০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগে, নতুন প্রযুক্তিতে তা ৩০০-৪০০ কিলোওয়াটে নামিয়ে আনা যাচ্ছে।’

বিএসএমএর প্রেসিডেন্ট জানান, নতুন প্রযুক্তির উচ্চ শক্তিসম্পন্ন রড ব্যবহারে নির্মাণে রডের প্রয়োজনও কমে। ৫০০ গ্রেডের রডের তুলনায় ৬০০ গ্রেডের রডের শক্তি প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। ফলে সঠিক নকশায় এ ধরনের রড ব্যবহার করলে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত রডের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এ ধরনের প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে অর্থায়ন, কর ও মূল্য সংযোজন করের ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়া দরকার। একই সঙ্গে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন রডের ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে নির্মাণকাজের নকশায় বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই-তিন লাখ আবাসনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে স্পেসজিরো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘স্মার্ট আবাসনের আগে পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দেশে উৎপাদিত মোট জ্বালানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। এ খাতকে স্মার্ট ও সবুজ করা গেলে জ্বালানি ব্যবহারে বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব। স্মার্ট আবাসন মানেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সোলার রুফ বা বিভিন্ন গ্যাজেট নয়। বরং ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার কমানো এবং জীবনচক্রে ব্যয় কমানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোনো ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও সেটি যদি কর্মস্থল ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলে বাসিন্দাদের দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে পরিবহনজনিত কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে। তাই আবাসন পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন, অবকাঠামো ও হাঁটার উপযোগী নগর পরিবেশকেও সমন্বিত করতে হবে। দেশে স্মার্ট ও সবুজ নগরায়ণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নির্দেশনা রয়েছে। বিএনবিসি, স্রেডাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এ বিষয়ে কাঠামোও তৈরি হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এগুলো বাস্তবায়ন, বড় পরিসরে প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা।’