যাত্রীবাহী ট্রেন সচল রাখতে পথিমধ্যে চলন্ত পণ্যবাহী ট্রেন থেকে লোকোমোটিভ খুলে অন্য ট্রেনে সংযুক্ত করার ঘটনাও ঘটছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ৭-৮ ঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা যে যাত্রা, তা সম্পন্ন করতে তিন-চারদিন পর্যন্ত সময় লাগছে। এতে আমদানি-রফতানি পণ্য, কনটেইনার এবং জ্বালানি পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর আইসিডিতে পণ্যের জট বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৬০৩ নম্বর কনটেইনার ট্রেনটি গত ২৮ জুন বিকাল ৫টায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে ২৯ জুন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে লাকসাম স্টেশনে পৌঁছে। সেখানে লোকোমোটিভ বিকল হয়ে পড়লে ট্রেনটি প্রায় ৫৬ ঘণ্টা ৫০ মিনিট আটকে থাকে। বিকল্প লোকোমোটিভ পাওয়ার পর ১ জুলাই বিকালে ট্রেনটি আবার যাত্রা শুরু করে এবং ২ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর আইসিডিতে পৌঁছে। পুরো যাত্রায় সময় লাগে ৭৯ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বা ৩ দিন ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
একইভাবে ৬০১ নম্বর কনটেইনার ট্রেনটি ১ জুলাই ভোরে সিজিপিওয়াই স্টেশন থেকে ছেড়ে মাত্র ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে লাকসামে পৌঁছায়। তবে ঢাকা-সিলেট রুটের উপকূল এক্সপ্রেসের লোকোমোটিভ বিকল হয়ে গেলে কনটেইনার ট্রেনটির ২৯২০ সিরিজের লোকোমোটিভ খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করা হয়। বিকল্প লোকোমোটিভ না থাকায় ট্রেনটি প্রায় ২০ ঘণ্টা ৫ মিনিট লাকসামে অপেক্ষা করে। পরে নতুন লোকোমোটিভ সংযুক্ত করে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে এবং মোট ৩১ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছায়।
রেলওয়ের অপারেশন নথি অনুযায়ী, গত ২৯ জুন চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী ৯৫১ নম্বর জ্বালানিবাহী ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছতে সময় নিয়েছে ৪৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট। ফিরতি ৯৫২ নম্বর ট্রেনের লোকোমোটিভ যাত্রীবাহী উদয়ন এক্সপ্রেসে সরিয়ে নেয়ায় খালি ওয়াগনের রেকটি দীর্ঘ সময় সিলেটে আটকে রয়েছে। একইভাবে ২৫ জুন থেকে শ্রীমঙ্গলগামী ৯৬১ নম্বর জ্বালানিবাহী ট্রেনটিও লোকোমোটিভের অভাবে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে অপেক্ষমাণ রয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে দৈনিক ১১৯টি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হলেও সচল অবস্থায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৭০-৭৪টি। পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য দৈনিক প্রায় ১৬টি লোকোমোটিভের চাহিদা থাকলেও বাস্তবে দুই থেকে সর্বোচ্চ তিনটি সরবরাহ করা যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন পণ্য পরিবহনের জন্য একটি লোকোমোটিভও বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জটও বাড়ছে। ১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকাগামী ১১৮টি কনটেইনার অপেক্ষমাণ ছিল। একই সময় সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০৩টিতে। ১ জুলাই সকাল থেকে ২ জুলাই বিকাল পর্যন্ত ইঞ্জিন সংকটের কারণে কোনো কনটেইনার ট্রেন চলাচল করেনি। পরে ২ জুলাই বিকালে ৬০৩ নম্বর এবং রাতে ৬০১ নম্বর কনটেইনার ট্রেন ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের লোকোমোটিভ সংকট দীর্ঘদিনের। আগের আমদানি উদ্যোগগুলো বিলম্বিত হওয়ায় এখন সংকট বেড়েছে। সরকার দ্রুততার সঙ্গে নতুন করে আমদানি ও পুরনো লোকোমোটিভ মেরামতে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমদানি হতে কয়েক বছর সময় লাগলেও পুরনো লোকোমোটিভ মেরামতের মাধ্যমে কিছুদিনের মধ্যে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।’
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘মিটারগেজ লোকোমোটিভের সংকট বর্তমানে চরম পর্যায়ে। পুরনো ইঞ্জিন মেরামত করে কিছুটা সক্ষমতা বাড়ানো গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। নতুন লোকোমোটিভ দ্রুত আমদানি ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব হবে না।
রেলের বাণিজ্যিক ও পরিবহন বিভাগ বলছে, জ্বালানি, কনটেইনার ও খাদ্যশস্য পরিবহনকারী ট্রেনগুলো রেলের সবচেয়ে লাভজনক সেবা। কিন্তু লোকোমোটিভ সংকটের কারণে এসব ট্রেন নিয়মিত পরিচালনা করা যাচ্ছে না। এতে শুধু রেলের রাজস্বই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










