আরিফুল ইসলাম আদীব। ঢাকা-১৮ আসনে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থী। শাপলা কলি প্রতীকের এ প্রার্থী নির্বাচনে নিজের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।
নির্বাচনী প্রচারণায় কেমন জনগণের কাছ থেকে কেমন সাড়া পেয়েছেন?
প্রচারণা বেশ ভালো চলেছে। আমরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে ঢাকা-১৮ আসনের সবগুলো ওয়ার্ডের প্রতিটিতে জনসংযোগ, মিছিল এবং উঠান বৈঠক করেছি। একই সঙ্গে আমরা ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়েছি। সব স্তরের মানুষ—শ্রমিক থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত, উচ্চশিক্ষিত থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই ব্যাপক সাড়া দিয়েছেন। এ সাড়াটা আসলে পরিবর্তনের। মানুষ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদ দেখেছে, তারও আগে ৫৪ বছরের রাষ্ট্র কাঠামোতে তাদের অধিকার খুব একটা প্রতিফলিত হতে দেখেনি। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চায়, আর সেখানেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা? প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী মনে করছেন?
আমাদের রাজনৈতিক জন্মই হয়েছে চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লড়াই করে আমরা আজকের এ অবস্থানে এসেছি। বর্তমান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমাদের প্রতিপক্ষ এখনো পুরনো রাজনৈতিক মডেলে চলছে। আমার ওপর সরাসরি হামলা হয়েছে। প্রচারণা চালানোর সময় বিশেষ করে নারী কর্মীদের নানাভাবে উত্যক্ত করা হচ্ছে, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আমার প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীর ভাই (জাহাঙ্গীর আলম) সামনে খুব সৌজন্য দেখান, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্র দখল ও হুমকির মাধ্যমে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। তবে আমরা মনে করি, এ পুরনো ধূর্ত কৌশলগুলো মানুষ এখন আর গ্রহণ করবে না।
ঢাকা-১৮ আসন নিয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
আমার মূল স্লোগান হলো—"পরিকল্পিত, নিরাপদ ও ইনসাফের নগরী"। ঢাকা-১৮ আসনটি বেশ বড় এলঅকা নিয়ে। এর মধ্যে উত্তরা মডেল টাউন এলাকাটি দেখতে সুন্দর হলেও এটি পুরো আসনের মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত ও তুরাগে বাস করেন, যারা চরম অবহেলিত। আমার পরিকল্পনার অগ্রাধিকারের কিছু বিষয় হল নাগরিক সেবার সমবণ্টন,নিরাপদ আবাসন ও শিক্ষা, জানজট ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত শাসন। উত্তরখান-দক্ষিণখানের মানুষ বছরের পর বছর ট্যাক্স দিলেও নূন্যতম ড্রেনেজ, গ্যাস বা প্রশস্ত রাস্তা পাচ্ছে না। আমি প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতে আবাসিক এলাকায় ফায়ার সেফটি নিশ্চত, ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গোদাম অপসারণের মত উদ্যোগ নিতে চাই। এ এলাকায় আরেকটি সমস্যা প্রয়োজনীয় সরকারি বিদ্যালয় নেই যার ফলে নিম্ন মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারড়গুলোকে সন্তানকে পড়াতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। আমার নির্বাচনী ইশতেহারে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরকারি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যমান স্কুলের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, সড়কগুলোতে যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে হকারদের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আনা এবং অটোরিকশাকে রেগুলেশনের আওতায় এনে জানজট কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আমার ইশতেহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমন্বিত শাসন। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা এবং সংসদ সদস্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে এবং এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে আমি একটি 'ইন্টিগ্রেটেড গভর্নেন্স' মডেল ও 'ঢাকা চার্টার' বাস্তবায়ন করতে চাই।
১১ দলীয় জোটে থাকলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি পৃথকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেছে। জয়ী হলে ইশতেহারের পার্থক্যগুলো কীভাবে সমন্বয় করবেন?
আমাদের এ জোট মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: বিচার, সংস্কার এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান। যেহেতু দলগুলো আলাদা, তাই নিজস্ব আদর্শ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যগুলোতে কোনো বিরোধ নেই। যেমন—নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচার। কিছু বিষয়ে (যেমন কর্মঘণ্টা) ভিন্নতা থাকলেও বৃহত্তর আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধান সম্ভব। আমরা মূলত অভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কি কোনো শঙ্কা বা ভয় কাজ করছে?
কিছুটা শঙ্কা তো আছেই। পুরনো এস্টাবলিশমেন্ট এবং প্রশাসনের একটি অংশ এখনো পুরনো দলগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিছু বুদ্ধিজীবী ও সংবাদমাধ্যম সম্পাদকও একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাচ্ছেন, যা জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। তবে আমি মনে করি, ১২ তারিখের নির্বাচনে নারী ভোটাররা একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন। বিশেষ করে মায়েদের মধ্যে যে নীরব বিপ্লব বা 'মাদারস রেভল্যুশন' তৈরি হয়েছে, তা সব সমীকরণ বদলে দেবে।
আপনার মতে নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি?
প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐক্য। ১৭ বছর ধরে আমাদের জাতিগতভাবে বিভক্ত করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে বিভক্তির এ রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসাটাই বড় কাজ। আর সম্ভাবনা হচ্ছে—জাতীয় স্বার্থ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, তবে এ তরুণ প্রজন্মই একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।













