সাম্প্রতিক সময়ে ছুটির দিনেও বিদ্যুতের চাহিদা কমছে না; বরং কখনো তা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির কারণে একই সময়ে লোডশেডিংও করতে হচ্ছে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) গতকালের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলন অনুযায়ী, দিনের বেলায় সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭০ মেগাওয়াট। আর রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৬ হাজার ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। তবে বাস্তব পরিস্থিতি প্রাক্কলনকে ছাড়িয়ে গেছে। বিপিডিবির ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট রাত ১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়। ফলে ওই সময় লোডশেডিং করতে হয়েছে ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত এটিই ছিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াটের ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ এ সময়জুড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। সকাল ৯টার পর বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমতে শুরু করলে লোডশেডিংও কমে দেড় হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে পারছে না বিপিডিবি। ফলে বিতরণ এলাকায় চাহিদা ও সরবরাহের পরিস্থিতি বিবেচনায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। মফস্বলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায়ও দিন ও রাতে এলাকাভেদে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ অফিস বন্ধ থাকায় সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা কর্মদিবসের তুলনায় দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট কম থাকার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় দেখা যাচ্ছে, ছুটির দিনেও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং কোনো কোনো সময়ে তা কর্মদিবসের চাহিদাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বিপিডিবি যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা প্রাক্কলন করছে, প্রকৃত চাহিদা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে তার চেয়েও বেশিতে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কেন বিদ্যুতের চাহিদা এত বেশি থাকছে, সে বিষয়ে অবশ্য বিপিডিবির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক শিল্প-কারখানা সপ্তাহের বেশির ভাগ সময় তাদের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। ফলে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অনেক কারখানা সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অনেক শিল্প-কারখানা সাধারণত গ্রিডের বিদ্যুতের পরিবর্তে নিজস্ব ক্যাপটিভ জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে প্রায় এক মাস ধরে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাই প্রয়োজনীয় মাত্রায় ক্যাপটিভ জেনারেটর চালাতে পারছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে তাদের গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
শিল্প-কারখানার এ অতিরিক্ত গ্রিডনির্ভরতার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সপ্তাহের অন্যান্য দিনে গ্যাস সংকটের কারণে ব্যাহত হওয়া উৎপাদন পুষিয়ে নিতে ছুটির দিনেও কারখানা চালু থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা কমার পরিবর্তে বাড়তে পারে।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছুটির দিনেও কেন চাহিদা এত বেশি থাকছে এটার কোনো জবাব নেই আসলে। বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে বলেই হয়তো চাহিদা কমছে না। অনেক সময় লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলো ঠিকমতো উৎপাদনে থাকে না, ছুটির দিনগুলোয় তাই চালু রাখছে। এজন্যও চাহিদা একই রকম থাকছে হয়তো। নতুন করে বিদ্যুৎ চাহিদার ব্যাটারি চার্জিং (অটোরিকশা) ছাড়া অন্য কোনো ব্যবহারিক খাত তো আমরা দেখছি না।’
দেশে বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। তবে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে এসব কেন্দ্র বরাদ্দ পাচ্ছে মাত্র ৮৮০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় সক্ষমতার বড় একটি অংশ অলস পড়ে থাকছে।
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কয়লা ও জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। তবে সেখানেও জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সব কেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে শেষ পর্যন্ত বিতরণ এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিপিডিবিকে।










