জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভাড়া বাড়ানোর জন্য পরিবহন মালিকদের ডাকা গত কয়েকদিনের ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় সব খাতে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে কনটেইনার জট। দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দর দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, তার ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট। ফলে সেখানে কনটেইনার জট তৈরি হওয়ায় বড়দিন উপলক্ষে পাওয়া ক্রয়াদেশের পণ্য পাঠাতে আকাশপথের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে পোশাক কারখানাগুলোকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মঘট উঠে গেলেও তার রেশ রয়ে গেছে। ধর্মঘটের কারণে নির্ধারিত সময়ে বন্দরে পৌঁছতে পারেনি পণ্যগুলো। ফলে সেগুলো ছাড়াই ছেড়েছে নির্ধারিত জাহাজ। এখন এসব পণ্য পরের জাহাজে পাঠাতে আরো অন্তত এক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। যার প্রভাব আদতে বেশ দীর্ঘমেয়াদি। কারণ নাব্যতা সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারে না। তাই এখান থেকে ফিডার জাহাজে পণ্য পাঠাতে হয় সিঙ্গাপুর বা শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপের উদ্দেশে যায় বাংলাদেশী এসব পণ্য। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে ক্রেতার ওয়্যারহাউজে পণ্য পৌঁছতে কখনো কখনো এক মাস সময়ও লেগে যায়। ধর্মঘটের কারণে যারা ফিডার জাহাজ ধরতে পারেনি, তারা মাদার ভেসেলও ধরতে পারবে না। তাই অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী জাহাজের জন্য। এ অবস্থায় যেসব রফতানিকারক বড়দিন সামনে রেখে দেয়া ক্রয়াদেশগুলো পাঠাতে চান, তাদের জন্য আকাশপথের বিকল্প নেই। এরই মধ্যে চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে এয়ার ফ্রেইটারগুলোর।
তৈরি পোশাক মালিক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক ধর্মঘটের কারণে টানা চারদিন রফতানি পণ্য আটকে ছিল। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন রফতানিকারকরা। সময়মতো পণ্য পাঠানো যায়নি। এখন পরিস্থিতি মোকাবেলায় এয়ার ফ্রেইটের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। যদিও আকাশপথে পণ্য পরিবহন অনেক ব্যয়বহুল। ফলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে আমাদের। আবার আকাশপথেও পণ্য পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত রোব ও সোমবার প্রতিদিন তিনটি করে মোট ছয়টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যায়। এগুলোতে ৩ হাজার ৪০০ টিইইউএস রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বন্দর ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ৪৯ হাজার ১৮ টিইইউএস। সেখানে এখন প্রায় ৪০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার অবস্থান করছে, যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ফলে ইয়ার্ডে হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। ধর্মঘটের চারদিনে প্রায় ১২ হাজার টিইইউএস আমদানি পণ্য চালান খালাস ও পাঁচ হাজার টিইইউএস রফতানিবাহী পণ্য চালান জাহাজীকরণ সম্ভব হয়নি। শুধু তা-ই নয়, চারদিন ধরে কনটেইনার পরিবহন না হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে কনটেইনার জটের আশঙ্কাও করছে কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) পরিচালক ও টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব কনটেইনার জাহাজ ধরতে পারেনি তারা সমস্যায় পড়ে গেল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ল সেসব পণ্যের রফতানিকারকরা যারা মূলত আসন্ন বড়দিন উৎসবকে ঘিরে জাহাজীকরণ করতে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় আসন্ন ক্রিসমাস ও শীতকালীন চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের গার্মেন্ট রফতানিকারকদের ক্রেতাদের কাছে পণ্যসামগ্রী দ্রুত পাঠাতে বিকল্প হিসেবে এয়ার কার্গো পরিবহন ব্যবহার করার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে গত কয়েক দিন কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক না চলায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে নতুন পণ্য না আসায় আগে থেকে জমে থাকা পণ্যগুলো এরই মধ্যে আকাশপথে চলে গেছে। তবে সমুদ্রপথে যেসব পণ্য যেতে পারল না, সেসব পণ্য বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজে নেয়া হলে প্রকৃত চাহিদার বিষয়টি সামনে চলে আসবে।
জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকায় সপ্তাহে চার-পাঁচটি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে কাতার এয়ারওয়েজ। দুটি কার্গো ফ্লাইট রয়েছে সিল্ক এয়ারের। এয়ারলাইনস দুটির প্রতি ফ্লাইটে কার্গো পরিবহন সক্ষমতা ১০০ টন। অন্যদিকে টার্কিশ এয়ারলাইনস ঢাকায় সপ্তাহে দুটি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করে, যেগুলোর প্রতিটির সক্ষমতা ৬৫ টন। এছাড়া রাশিয়ার উড়োজাহাজ সংস্থা এয়ার ব্রিজ ঢাকায় সপ্তাহে দুটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। যার প্রতিটির সক্ষমতা ১০০ টন। এর বাইরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, এমিরেটস এয়ারলাইনস, কুয়েত এয়ারওয়েজ, মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস, এয়ার অ্যারাবিয়া, সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী এয়ারলাইনসও কার্গো হোল্ডের মাধ্যমে প্রতি ফ্লাইটে তিন থেকে সাত টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করে।
রফতানিকারকরা বলছেন, আকাশপথে কার্গো পাঠাতে বাংলাদেশে যে খরচ হয় তা প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। হ্যান্ডলিংসহ অন্যান্য খরচ বাবদ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেখানে কেজিপ্রতি খরচ হয় ১৮-২০ সেন্ট, সেখানে কলকাতা বিমানবন্দরে এ খরচ ৮-১০ সেন্ট।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের তথ্য বলছে, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আকাশপথে ইউরোপে পণ্য রফতানিতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে ৪ থেকে ৫ ডলার, যা গত বছরও ছিল কেজিপ্রতি ২ থেকে ২ ডলার ২০ সেন্ট। এর সঙ্গে যোগ হয় হ্যান্ডলিংসহ অন্যান্য খরচ। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতি কেজিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টার্মিনাল হ্যান্ডলিং চার্জ বাবদ ৮ সেন্ট ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সিকিউরিটি স্ক্যানিং চার্জ বাবদ ৬ সেন্ট। আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে যেটা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮-২০ সেন্টের মতো।
বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে বিভিন্ন গার্মেন্ট পণ্য (তৈরি পোশাক) উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে যায়। চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত আকাশপথের মাধ্যমে তৈরি পোশাক পরিবহন হয়েছে ৯২ হাজার ২০২ টন। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ১০৬ টন। আর ২০১৯ সালে তৈরি পোশাক পরিবহন হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৩৮ টন ও ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৪৪৭ টন। এছাড়া ওষুধ, সবজি, শুকনো খাবার, ফলমূল মিলে প্রতিদিন গড়ে ৯০ টন পণ্য আকাশপথে উড়ে চলে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।









