বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভুলে না যেতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও এর মানবিক সহায়তা অংশীদাররা। সংস্থাটি বলছে, অর্থায়ন কমে আসা ও বৈশ্বিক মানবিক সংকটের চাপের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
জেনেভায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বছর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণহারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। বর্তমানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত হয়ে আসছেন। বাংলাদেশ ৭০ এর দশকের শেষভাগ থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা এসব শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের আগস্টে। সে সময় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সংস্থাটি বলছে, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অস্থিতিশীলতা ও মানবিক সংকটের কারণে সীমিত সম্পদের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সেবা হুমকির মুখে পড়ছে।
গত মাসে বাংলাদেশ সরকারকে সঙ্গে নিয়ে জাতিসংঘ ও এর অংশীদাররা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। প্রয়োজন বাড়লেও এ আবেদন গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০১৭ সালের পর থেকে মানবিক অর্থায়ন জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনে সহায়তা করেছে। তবে এখনো বড় ধরনের মানবিক চাহিদা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত না থাকলে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরো বাড়বে।
বর্তমানে রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং কমে যাওয়া সহায়তা তাদের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইনের নতুন সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের পরিস্থিতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা, নিপীড়ন ও সংঘাত অব্যাহত থাকায় নিজ দেশে ফেরার আশা আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে। এ কারণে অনেক শরণার্থী উন্নত জীবনের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে এ ধরনের যাত্রা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহায়তার আবেদনে সাড়া দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের ৬০ শতাংশ দিয়েছে। তবে শুধু ন্যূনতম সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত অর্থায়ন না হলে শরণার্থীদের জীবন আরো কঠিন হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে সংকট মোকাবেলার ব্যয় ও জটিলতা বাড়বে।
ইউএনএইচসিআর মনে করে, মিয়ানমারে সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।









