হাতির নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বন বিভাগের মাঠকর্মী, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষার্থী, তরুণ, গবেষক ও গণমাধ্যমসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, হাতির আবাসস্থল রক্ষা শুধু হাতি নয়, বন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যও জরুরি।

বুধবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব হাতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের বিশ্ব হাতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ব্রিংগিং দ্য ওয়ার্ল্ড টুগেদার টু হেল্প এলিফ্যান্টস’ বা ‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’।

মন্ত্রী বলেন, দেশে হাতির সংখ্যা ক্রমেই কমছে। আবাসস্থল দখল ও ধ্বংস, বন উজাড়, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী অপরাধ হাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতি ছিল ২৬৮টি, পরিযায়ী বন্য হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতি ৯৬টি। ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন করে হাতি জরিপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

হাতি সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মানুষ-হাতি সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘‌বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত হাতির আক্রমণে নিহত ৩২২ ব্যক্তির পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে বন অধিদপ্তরকে নির্দেশনাও দেন তিনি।

মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, হাতি অধ্যুষিত এলাকায় এখন পর্যন্ত ১৫৯টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। এসব দল হাতির আগমন সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেয়া, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ উপায়ে মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে কাজ করছে। স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে হাতি সংরক্ষণ টেকসই হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল তার নির্বাচনী এলাকায় হাতির আক্রমণ ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিকল্প নেই।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, হাতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই বিপন্ন। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হাতি সংরক্ষণে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল মোতালেব হাতি সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে হাতি সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।