কারিগরি শিক্ষার প্রসার বৃদ্ধি ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৬ সালে লক্ষ্মীপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১২৪টি। সেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২২ জন। এছাড়া স্কিল অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের আওতায় কর্মরত তিনজনসহ পাঠদান করছেন আরো ১০ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক। শুধু শিক্ষক নয়, যন্ত্রপাতি সংকট থাকায় যথাসময়ে হচ্ছে না তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসও। এতে ব্যাহত হচ্ছে গুণগত কারিগরি শিক্ষা।
শিক্ষকরা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর ক্লাস পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। নিয়মিত করানো যাচ্ছে না তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসও। প্রতিষ্ঠানটিতে সিভিল ডিপার্টমেন্টে ২৪ শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র দুজন। আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে ১২ শিক্ষকের বিপরীতে নিয়মিত শিক্ষক একজনও নেই। তবে স্কিল অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের দুজন শিক্ষক থাকলেও ৫৩ মাসের বেতন বকেয়া তাদের।
সিভিল ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর সাজ্জাদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশের ৫০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মতো লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও এখানে তীব্র সংকট রয়েছে। সিভিল ডিপার্টমেন্টে ৬০০-৮০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। সে হিসাবে শিক্ষক থাকার কথা ২৪ জন। তবে রয়েছেন মাত্র দুজন। কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক থাকলেও তা অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসে সঠিক ও সময়োপযোগী শিক্ষাদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) অধীনে ইনস্ট্রাক্টর ও জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর দুটি পদে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা হলেও ফলাফল প্রকাশে বিলম্বিত হচ্ছে। দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করে শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
একই অবস্থা দেখা গেছে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে। সেখানে ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র তিনজন। তবে তারা স্কিল অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পেয়েছেন।
ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর আবু ওবায়দা বলেন, ‘২০১৫ সালে প্রকল্পের আওতায় আমরা তিনজন শিক্ষক আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ পেয়েছি। ডিপার্টমেন্টে ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তারা তিনজনই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন। এক শিফটের ক্লাস শেষ করতে না করতে আবার অন্য শিফটের ক্লাস নিতে গিয়ে হিমিশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর আবার ৫৩ মাসের বেতন বকেয়া।’
স্কিল অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পেয়েছেন ইলেকট্রনিকস ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর ইউসুফ হাসান। তিনি বলেন, ‘৫৩ মাসের বেতন বকেয়া হলে একজন শিক্ষকের পরিবার কীভাবে চলে? ২০১৪ সালে সরকার প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণের অনুমোদন দিয়েছে। তার পরও কেন আমাদের চাকরি স্থায়ী হলো না? শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর, তাহলে এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের রাখা হয়েছে কেন?’
এদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না তাদের। নানা সংকটে ব্যবহারিক ক্লাস থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যাও। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান। নিয়মিত ক্লাস না পাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে তাদের শিক্ষা জীবন।
সিভিল ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এনামুল বলেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষার পর বাব-মায়ের স্বপ্ন ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবে। কিন্তু এখন কারিগরি শিক্ষাই আমার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারিগরি বিভাগে ভর্তি হয়েছি হাতে কলমে শিক্ষা অর্জনের জন্য। ১০ নভেম্বর থেকে ফাইনাল পরীক্ষা। অথচ একটি ব্যবহারিক ক্লাসও করানো হয়নি। যারা ল্যাব ক্লাস নেন, তারা নিজেরাই যন্ত্রপাতির নাম বলতে পারেন না। আমাদের কী শেখাবেন।’
সিভিল ও আর্কিটেকচারসহ কয়েকটি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা জানান, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বেশির ভাগ ক্লাস নেয়া হয় খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে। খণ্ডকালীন শিক্ষকের দক্ষতা আর একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের দক্ষতা কখনো এক নয়। এ কারণে মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছেন না তারা। তাছাড়া ল্যাবের যন্ত্রপাতি নষ্ট হলেও মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয় না। প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন যন্ত্র কেনার জন্য বসে থাকে কর্তৃপক্ষ। সময়মতো ল্যাবে ক্লাস করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাবে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেও তাদের বেকার থাকতে হতে পারে।
এ বিষয়ে পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের পরও শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। রাজস্ব খাতে ২২ জন ও খণ্ডকালীন আটজনসহ ৪০ জন শিক্ষক দিয়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। শিক্ষক সংকটসহ অন্যান্য সমস্যার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিক্ষক সংকট নিরসন হলে প্রতিষ্ঠানটি ফিরে পাবে স্বাভাবিক কার্যক্রম।’










