চট্টগ্রামের আকবরশাহ এলাকায় গত ৭ এপ্রিল পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়। একই এলাকায় গত বছরের ১৭ জুন পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছিল চারজনের। তবে নগরীতে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেদিন সাতটি পৃথক এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যায় ১২৭ জন। গত পাঁচদিনের টানা বর্ষণে আবারো চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একসময় পাহাড়ের নগরী হিসেবে পরিচিতি ছিল চট্টগ্রামের। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অবৈধ দখলদারত্ব আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতায় কেটে ফেলা হয়েছে বেশির ভাগ পাহাড়। ২০০৭ সালের ১১ জুন পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার এমএন সিদ্দিককে প্রধান করে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১৮ সদস্যের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয় সে সময়। এ কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে ৩৬ দফা সুপারিশ করলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
কয়েকদিন ধরে নতুন করে টানা বৃষ্টিতে বন্দরনগরীতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকবরশাহর বিজয়নগর ও ঝিল পাহাড়, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ ও খুলশী থানা এলাকার ছয়টি পাহাড় থেকে লোকজনকে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মোট ১ হাজার ৫০টি পরিবারকে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন।
টানা বৃষ্টির কারণে গত শুক্রবার সকালে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় চলন্ত গাড়ির ওপর পাহাড়ধসের ঘটনায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরে মাটি সরানো হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ টাইগারপাস এলাকার পাশেই মতিঝর্ণা ও বাটালী হিলসংলগ্ন পাহাড় অবস্থিত, যেখানে বসবাস করছে সহস্রাধিক পরিবার। সোমবার সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ধসে চারজন আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়গুলো অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকা করে সেখান থেকে পাহাড়ে অবস্থানকারীদের সরিয়ে নেয়ার কাজ করছি। আদালতে মামলা ও রিট থাকায় কিছুটা জটিলতা আছে। যারা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বেলে মাটির হওয়ায় এ পাহাড়গুলোর অনেক জায়গা এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। এখন টানা বৃষ্টির কারণে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে অবৈধভাবে পাহাড়গুলোয় বসবাসকারীদের সরিয়ে না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটতে পারে।
অতীতে দেখা গেছে, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি বর্ষা মৌসুম আসার আগে বৈঠক করে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কিছু লোক দেখানো উচ্ছেদ করা হলেও আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের তথ্য বলছে, গত দুই যুগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিদস্যুরা গ্রামে প্রায় ৪০ ও শহরে ৬০ শতাংশ পাহাড় কেটে ধ্বংস করেছে। নগরীর বেশির ভাগ পাহাড় কাটা হয়েছে পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখানবাজার, মতিঝর্ণা, ষোলশহর ও ফয়’স লেক এলাকা থেকে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪০ বছর আগে পাহাড় ছিল ২০০টি, যার ৬০ শতাংশই আজ বিলুপ্ত। স্বাধীনতার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৮৮টি পাহাড় পুরোটাই বিলুপ্ত হয়েছে। একই সময়ে আংশিকভাবে কাটা পড়েছে ৯৫টি।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্যমতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস প্রায় দুই হাজার পরিবারের। বিভিন্ন সময় নানা অভিযান চালানো সম্ভব হলেও বড় দুটি এলাকার পাহাড়ে অভিযান চালাতে পারেনি প্রশাসন। বড় পূর্ব ফিরোজশাহ ১ নং ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস প্রায় ৫০০টি পরিবারের। এ এলাকায় পাহাড়ে অভিযান না চালানোর জন্য হাইকোর্টে রিট থাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
খুলশী থানার লালখানবাজার এলাকার মতিঝর্ণা ও বাটালী হিলসংলগ্ন পাহাড়গুলোয় অবৈধভাবে বসবাস ৭০০টিরও বেশি পরিবারের। কিন্তু আদালতে দেওয়ানি মামলা ও রিট থাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
পাহাড় কেটে এসব আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পেছনে মূল কারিগর হিসেবে প্রথমেই সামনে আসে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের নাম। নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৭ সালের পর যে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তারা যে সুপারিশ দিয়েছিল তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং পাহাড়গুলোয় আবাসন বেড়েছে, পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরি করা হয়েছে। সেখানকার অবৈধ বসবাসকারীদের জন্য দেয়া হয়েছে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা। সেখানে যাবতীয় সুবিধা দিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত পাহাড় কাটার সহযোগী হিসেবে জড়িত। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণেও পাহাড়গুলোয় আবাসনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এসব কারণে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এমনকি বায়েজিদ লিংক রোড করার সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান সিডিএ নিজেই ১৬টির বেশি পাহাড় কেটেছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মেট্রো) মিয়া মাহমুদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান সমস্যা হচ্ছে একের পর এক পাহাড় কাটার ঘটনা। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা ছাড়াও মামলা করা হচ্ছে। দ্রুত চার্জশিট দেয়ার কাজ চলছে।’










