তবে সে তুলনায় বাড়েনি কর্মসংস্থান। বিশেষত শিল্প খাতে নতুন কাজ সৃষ্টি না হওয়া এজন্য দায়ী। ফলে তরুণদের অনেকে কৃষি, স্বকর্মসংস্থান কিংবা অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে শ্রমশক্তি স্থানান্তরের বদলে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ বাড়ার এ প্রবণতার কারণে শ্রমবাজারে বড় ধরনের কাঠামোগত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘রিভাইভিং অ্যান্ড রিকানেক্টিং ইকোনমিক গ্রোথ অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওয়ার্কিং পেপার ও বিশ্বব্যাংকের ‘রিপারপোসিং এগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স এগ্রিফুড সিস্টেম’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণদের ৪৫ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া শিল্পে ১৭ ও সেবা খাতে যুক্ত ৩৮ শতাংশ। যদিও ২০১৭ সালে কর্মরত যুবকদের ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ কৃষিবহির্ভূত খাতে ছিল। ২০২২ সালে তা কমে ৫৮ দশমিক ৩ এবং ২০২৪ সালে মাত্র ৪৮ শতাংশ হয়। অর্থাৎ প্রতি বছর নতুন করে কৃষি খাতে বাড়ছে কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক যুব দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন প্রত্যাশা’।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের মোট কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ছিল ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আট বছরের ব্যবধানে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পে কর্মসংস্থানের অংশ ২০ দশমিক ৪২ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমেছে। সেবা খাতে কিছুটা কমে এসেছে। গত আট বছরে তা ৩৮ দশমিক ৯ থেকে নেমে হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
দেশে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা—দুই খাতেই কমেছে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি অর্থনীতির জন্য এ চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের উৎপাদনশীল ও অপেক্ষাকৃত উচ্চ মজুরির কর্মসংস্থানে যুক্ত করার সক্ষমতা অর্থনীতির কমে যাচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মাদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, ‘কৃষিতে এখনো অতিরিক্ত শ্রমিক অনেক। এখন যারা পড়াশোনা করছেন, তাদের একটা অংশ কৃষিতে যাচ্ছেন। নারীরা অনেক বেশি আনপেইড ফ্যামিলি ওয়ার্কার হিসেবে কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন। এ কাজের উৎপাদনশীলতা খুবই কম। সে তুলনায় শিল্প ও সেবা খাতে তরুণরা যেতে পারছেন না। আমরা এখন একটা ক্রিটিক্যাল ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি। সমস্যাটা হচ্ছে বাংলাদেশে আধুনিক উৎপাদনশীল খাত—ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেবা খাতে যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারা। অথচ উন্নত দেশগুলো কৃষি থেকে লোক কমিয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে যুক্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই রূপান্তরের দিকে যেতে পারছি না। ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে।’
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল ইউএনএফপিএর তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় ১১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ। তাদের বয়স ১৫-৬৪ বছরের মধ্যে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। বিপরীতে ওই সময়ে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ ৫৩ লাখই চাকরির সুযোগ পায়নি।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাত। এ খাতে উৎপাদনশীলতা ও মজুরি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে শুধু চাকরি তৈরি করাই নয়, ভালো ও উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি করাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউএনপিএর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সন্তান নেয়ার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশ তরুণ আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ও ৮৭ শতাংশ স্থায়ী কর্মসংস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ চাকরি ও আয় শুধু তরুণদের বর্তমান জীবন নয়, তাদের পরিবার গঠন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক ডিভিশনের পরিচালক জ্যঁ পেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সুযোগ দ্রুতই শেষ হয়ে আসছে। নারীদের ক্ষেত্রে বাধা আরো বেশি। প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুজনই কম উৎপাদনশীল স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান অথবা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ নারী কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করছেন। অথচ নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমছে। এ প্রবণতা উল্টে দিতে হলে আরো বেশি ও ভালো মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। সেজন্য বাংলাদেশকে অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। এজন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি মোকাবেলা করা প্রয়োজন। এগুলো হলো দক্ষতা, অবকাঠামো ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এক্ষেত্রে শিল্প খাতের সঙ্গে আরো শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো ঢাকার বাইরে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের বাইরেও সম্প্রসারণ করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। আর অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে সহজতর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বাণিজ্য ও এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে বাধা কমানো, লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর অর্থায়নে আরো ভালো সুযোগ নিশ্চিত করা। এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করতে পারে।’
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে যুব অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ করছে ‘প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’। সংস্থাটি বলছে, দেশের মোট বেকার জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশই তরুণ। এর মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মূল কারণ বাজার চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অসংগতি বা ‘স্কিলস মিসম্যাচ’। আমাদের দেশের আইসিটি বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবলের অভাব থাকলেও হাজার হাজার তরুণ ডিগ্রিধারী উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। সংস্থাটির অ্যাডভাইজার (ইয়ুথ ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট) কবির আহমেদ বলেন, ‘এখান থেকে উত্তরণে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউজিসির মাধ্যমে বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করার ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত দক্ষ যুবকর্মী থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে।’
তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যুব উন্নয়নে সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি হতে পারে দৃষ্টিভঙ্গিতে। তরুণরা শুধু সুবিধাভোগী নয়। তারা নীতির সহনির্মাতা, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও কমিউনিটি নেতা। জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা বা কর্মসংস্থান—যে নীতির প্রভাব তাদের জীবনে পড়ে, সেই নীতি তৈরির আলোচনায়ও তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকা উচিত।’
সরকার তরুণদের বেকারত্ব কমাতে ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বিপুলসংখ্যক যুব জনগোষ্ঠীকে, যারা এখনো প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি, তাদের টেকনিক্যালি দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। আমরা নতুন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি। মূলত বর্তমান বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব যুব কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ছয় মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে এসব কার্যক্রম সবার কাছে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।’
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ৫৫টি ট্রেডে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের জনশক্তি তৈরিতে কাজ চলছে। ৮টি ভাষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণে ড্রাইভিং, কেয়ারগিভিং কোর্স সফলভাবে চালু করা হয়েছে। বিদেশে কর্মী প্রেরণে প্রশিক্ষণও কোর্স চালু রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং বেকারত্ব কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত করা।’










