বিএনপি ও সমমনা দলের ডাকা টানা তিনদিনের অবরোধে যশোরে ট্রাক ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়েছেন চালকরা। স্বাভাবিক সময়ে বেনাপোল থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে ট্রাক ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। সেখানে এখন নেয়া হচ্ছে ২৫-২৬ হাজার টাকা। এ কারণে আমদানিও কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখন আমদানি প্রতিদিন হচ্ছে ১৫০-২০০ ট্রাক, যা স্বাভাবিক সময়ে ছিল ৩৫০-৪০০ ট্রাক।

তবে বেনাপোল বন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ট্রাফিক) রেজাউল করিম বলেন, ‘অবরোধের মধ্যেও বন্দরে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চলমান। গত দুদিনে ৩৭৫ ট্রাক পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে আমাদের এখান থেকে প্রতিদিন আমদানি হয় গড়ে ৪০০ ট্রাক। খালাস হয় ৩৫০-৪০০ ট্রাক। সে তুলনায় আমদানি ও খালাস কম হচ্ছে।’

বেনাপোল শুল্ক ভবনের যুগ্ম কমিশনার মো. শাফায়েত হোসেন বলেন, ‘বেনাপোল কাস্টম হাউজে শুল্কায়নের কাজ যথা নিয়মে চলেছে। আমদানি-রফতানি স্বাভাবিক রয়েছে।’ ট্রাক ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে খালাস করে নিয়ে যাচ্ছেন।

ঢাকার আমদানিকারক প্যাকস্টন লিমিটেডের প্রতিনিধি ফারুক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবরোধের কারণে বেনাপোল থেকে ঢাকায় আসতে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ৭-৮ হাজার টাকা। এতে আমাদের ব্যয়ও বাড়ছে।’

নারায়ণগঞ্জের আইডিয়াল ফাইবার লিমিটেডের প্রতিনিধি শাহ আলম বলেন, ‘একে তো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নেই। তারপর এখন বেড়েছে ট্রাক ভাড়া। ট্রাকপ্রতি বেশি নেয়া হচ্ছে ৭-৮ হাজার টাকা। আবার সরকার রাজস্বও বাড়িয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন।’

ঢাকার নবাবপুরের তালুকদার ট্রেডার্স নামের আমদানিকারক ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘আমার ব্যবসার কেমিক্যাল ভারত থেকে আসে। কয়েকটি পণ্যের চালান ৩১ সেপ্টেম্বর বেনাপোল বন্দরে এসেছে। বন্দরের সব আনুষ্ঠানিকতাও শেষ করেছি। গতকাল ট্রাক ভাড়া করতে গেলে ভাড়া এক লাফে ৮ হাজার টাকা বেশি বলছেন চালকরা। অতিরিক্ত ট্রাক ভাড়ার কারণে পণ্য বেনাপোল বন্দর থেকে কারখানায় নিতে পারছি না।’

তবে বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, ‘অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। এতে মালিকরা ট্রাক রাস্তায় নামাতে চাইছেন না। আবার চালকরাও গাড়ি চালাতে অসম্মতি জানাচ্ছেন। বেনাপোল বন্দর থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে।’

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি বলেন, ‘আগে বেনাপোল থেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনে প্রতি ট্রাকের ভাড়া ছিল সর্বনিম্ন ১৭-১৮ হাজার টাকা। একই ট্রাকের ভাড়া এখন বেড়ে হয়েছে ২৫-২৬ হাজার টাকা। একইভাবে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ২৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। এত বেশি ভাড়া দেয়া সত্ত্বেও খালি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।’

বেনাপোল আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, ‘পরিবহন সংকটের জন্য ট্রাক ভাড়া এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে খালাস করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।’

এদিকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শাকসবজি পরিবহনে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সপ্তাহখানেক আগেও শাকসবজির বাজার ছিল চড়া। দুই-তিনদিন আগে খানিকটা কমেছিল। তবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির কারণে পরিবহন খরচ বাড়ায়, বেড়ে গেছে শাকসবজির দাম। যার প্রভাব ক্রেতাদের ওপর পড়ছে বলে মনে করেন সবজি চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

যশোর সদর উপজেলার মথুরাপুর এলাকার আজগর আলী জানান, এক বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছেন তিনি। সপ্তাহখানেক ধরে বিক্রি করছেন। প্রথম দিকে প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলেও বুধবার সর্বোচ্চ ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হয়েছে। পরিবহন খরচের ভয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মুলা নেননি। এতে তাকে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।

পাইকারি বিক্রেতা মো. মনির হোসেন বলেন, ‘সবজি ঢাকায় পাঠাতে কোনো সমস্যা নেই। সাধারণত আন্দোলনকারীরা শাকসবজির ট্রাক নিয়ে ঝামেলা করে না। কিন্তু ট্রাকের চালকরা ঝুঁকি নিতে চান না, এজন্য বেশি টাকা ভাড়া দাবি করেন। স্বাভাবিক সময়ে চার টন ও সাত টন সবজি পাঠাতে আমার যথাক্রমে ১৬ ও ২২ হাজার টাকা লাগলেও হরতাল ও অবরোধে একই পরিমাণ সবজি পাঠাতে ২২-৩০ হাজার টাকা পরিবহন খরচ দিতে হয়।’