বাগেরহাটের চিতলমারীতে অপরিকল্পিতভাবে একটি খাল পুনর্খননের ফলে নালুয়া-ভোলা সড়কের প্রায় ৩০০ মিটার ধসে গেছে। খননকৃত মাটি ফেলার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছিল না। ফলে বিপাকে পড়েছেন ওই শতাধিক পরিবার। মাটি ফেলায় অনেক পরিবারের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ১১টি ঘরের বেশির ভাগ মাটির নিচে চলে গেছে বলে দাবি করেছে স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার নালুয়া-ভোলা সড়কের পাশে ৩০ থেকে ৪০ ফুট চওড়া হক ক্যানেল নামের এ খালের অবস্থান। ১২ কিলোমিটার এ খালের পুনর্খনন কাজ করছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত অর্থবছরে শুরু হওয়া এ পুনর্খনন কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে চলতি অর্থবছরের জুনে। এ কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শামীম আহসান জেবি। এরই মধ্যে ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

স্থানীয়রা বলছে, অপরিকল্পিতভাবে খননকাজ করায় নালুয়া-ভোলা সড়কের চার স্থানে ৩০০ মিটার ধসে গেছে। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, ধসে যাওয়া সড়কের দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক ধসে যাওয়ায় নিয়মিত যাতায়াত চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালের মাটি বসতঘর ও চলাচলের রাস্তায় ফেলা হয়েছে। এতে অনেক পরিবারের ঘর ভেঙে গেছে। বেশ কয়েকটি পরিবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। অন্তত ১১টি ঘরের বেশির ভাগ অংশ মাটির নিচে চলে গেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও খননকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ বৈদ্য ভারতে থাকায় অধীনস্থ কেউ এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি। তবে জেলা প্রশাসন বলছে, স্থানীয়দের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন কাজ হতে পারে না।

খননকৃত মাটির নিচে চাপা পড়েছে আকুব্বর শেখ, আনোয়ার সরদার, আমিনুর শেখ, সামাদ ব্যাপারিসহ বেশ কয়েক জনের ঘর। তারা বলেন, খাল খননের আগে আমাদের কোনো সময় দেয়া হয়নি। আমরা বলেছিলাম এভাবে মাটি রাখলে আমরা কোথায় থাকব। আমাদের কোনো কথা না শুনে ইচ্ছেমতো মাটি ফেলে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখন আমরা এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। মাটির নিচে আমাদের কয়েক জনের ঘর ও  মূল্যবান আসবাবপত্রও চলে গেছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে গেছি, তারাও কোনো সমাধান দিতে পারেননি। যারা খননকাজে নিয়োজিত, তারা প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে অন্যায় করছেন।

স্থানীয় রোজিনা বেগম ও রাহেলা বেগম বলেন, রাস্তার পাশেই আমাদের ছোট টিনসেড বিল্ডিং। খাল খননের মাটিতে যাতে আমাদের ভবনের ক্ষতি না হয়, সেজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উজ্জলকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তার পরও মাটি ফেলে আমাদের বিল্ডিংয়ের ক্ষতি করেছে তারা।

স্থানীয় পারুল বেগম বলেন, খালের মাটি এমনভাবে রেখেছে যে আমাদের ঘরের একটা অংশ মাটির নিচে চলে গেছে। পরে প্রায় ৫ হাজার টাকা ব্যয় করে ঘরের মাটি সরিয়েছি। কিন্তু মাটি সরালেও ঘরটি অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে ধসে যাওয়ার ফলে চিতলমারী উপজেলাবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নালুয়া-ভোলা সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার হাজারো মানুষ। ভ্যান ও সাইকেল ছাড়া অন্য যানবাহন চলাচল করতে পারছে না ওই সড়কে।

রবিউল ইসলাম, জাহাঙ্গীরসহ কয়েক জন ভ্যানচালক বলেন, প্রায় দুই মাস আগে এ রাস্তা ধসে গেছে। এতে আমরা ভ্যান চালাতে পারছি না। ফলে উপার্জনের পথও অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। আসলে রাস্তা ধস ও মানুষের বাড়িঘরে মাটি ফেলায় অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে। খাল খনন করবে তো আমাদের উপকারের জন্য। কিন্তু এখন দেখছি এভাবে থাকলে আমাদের এ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। ধসে যাওয়া রাস্তা মেরামত করে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ নিরসনের দাবি করেন তারা।

শিক্ষার্থী আসিকুর ফকির ও ময়না খানম বলেন, মাটি ফেলার ফলে আমাদের চলাচল একদম বন্ধ হয়ে গেছে। মাটিতে আমাদের ঘরবাড়িও ভেঙেছে। এলাকার অনেকের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা চাই আমরা।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী কৃষ্ণেন্দু বিকাশ সরকার বলেন, আমি ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। তবে আমাদের নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ বৈদ্য ভারতে অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে আমরা কোনো কথা বলতে পারব না।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আ ন ম ফয়জুল হক বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে জনগণের জন্য। জনগণকে সেচ সুবিধা দেয়ার জন্যই খাল পুনর্খনন করা হচ্ছে। খালের পাশে অনেক খালি জমি রয়েছে। খননকৃত মাটি খালি জমিতে না রেখে যদি স্থানীয় মানুষের বাড়িঘরে ফেলা হয়, তাতে যদি স্থানীয়দের বিছানাপত্র মাটির নিচে চলে যায়, রান্নাঘর মাটির নিচে চলে যায়, তা কোনো পরিকল্পনামাফিক কাজ হতে পারে না। খাল খননের ফলে যাতে স্থানীয় জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।