বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এলএনজি নির্ভরতা বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয় বরং সার্বিক শক্তি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু নবায়নযোগ্য দিয়ে হবে না। এটা অবশ্যই একটা মেজর পার্ট। কিন্তু দুনিয়া যেদিকে যাচ্ছে আমাদের সেদিকে যেতে হবে। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করে আমাদের চলবে না। শক্তি ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব দিতে হবে।’

আজ বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক এ পলিসি কনক্লেভ আয়োজন করে বণিক বার্তা।

তিনি আরো বলেন, আমাদের মানুষ ১৮ কোটি, আর আমাদের সীমাবদ্ধ হচ্ছে জমি। বাংলাদেশের রূপান্তর এই দুই সম্পদের সঙ্গেই জড়িত। সে হিসাবে আমাদের মনোযোগটা সেদিকেই দেয়া দরকার।

কৃষির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের যে শ্রমশক্তি আছে তার ৪০ শতাংশের বেশি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তার মানে সবাই সার্বক্ষণিক কৃষক নয়, কিন্তু তাদের জীবিকার জন্য কৃষিটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জিডিপিতে কৃষির অংশগ্রহণ বড়জোর ১৩ শতাংশ। তাহলে এই জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে, এত শ্রমশক্তি এখানে জড়িত আছে, অথচ জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশন এতটুকু। অর্থাৎ এখানে একটি বিরাট দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এখন আমাদের শক্তির দিকে যদি দেখি তাহলে আমাদের গ্যাস সরবরাহের মোটামুটি ৩৫ শতাংশ এলএনজি-নির্ভর। আর এই গ্যাস থেকে যে গ্রিড পাওয়ার এবং ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশন হচ্ছে, সেটা প্রায় ৬০ শতাংশ। তার মানে আমাদের পাওয়ার সিস্টেম এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। তার মানে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজার এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের বিদ্যুৎ খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এদিকে আমাদের মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬৫০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এটা যদি আমরা ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে আমরা ভিয়েতনামের মাত্র ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করছি। থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রায় ২০ শতাংশ। তাহলে ওই জায়গায় যেতে আমাদের উৎপাদন কতটা বাড়াতে হবে, সেটা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।

বুয়েটের এ অধ্যাপক বলেন, আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলের মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি। বাকি ৯৭ শতাংশ বেসরকারি। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ পাবেন না, যেখানে মাধ্যমিক শিক্ষা এভাবে প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

চারটি ক্ষেত্রে কাজ করার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক হাসিব বলেন, এ চারটি ক্ষেত্রে—কৃষি, শিক্ষা, শক্তি এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস। আমি কিন্তু শিল্প বলছি না। শিল্প এমনিতেই আসবে। এ চারটি খাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমগ্র শক্তি ব্যবস্থাপনাকে সাজাতে হবে। শুধু জ্বালানি নয়, পুরো শক্তি ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ শক্তি নিরাপত্তাকে এ প্রধান খাতগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে শক্তি নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় তিনটি সমস্যা, কিছুটা হুমকিও বলা যায়, হচ্ছে প্রথমত দুর্নীতি, দ্বিতীয়ত অদক্ষতা, তৃতীয়ত নীতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি। দুর্নীতি এনার্জি সেক্টর কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেটা আমি জাতীয় রিভিউ কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করার সময় দেখেছি। বহু পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টে দেখা গেছে, কীভাবে রেন্ট-সিকিং প্রবণতা চুক্তির ভেতরে ঢুকে বসে আছে। প্রত্যেকটি চুক্তিতে নয়, কিন্তু বহু চুক্তিতে এ প্রবণতা রয়েছে। দুর্নীতির কারণেই আমরা আজ বহু ধরনের ভোগান্তির মধ্যে আছি। এখন অদক্ষতার কথায় আসি। কৃষিতে যেমন উৎপাদনের পরে এত অপচয় হচ্ছে, সেটাও এক ধরনের অদক্ষতা। আবার আমাদের মানবসম্পদের অদক্ষতা আছে। দক্ষতার কথা বললে, এলএনজি এনে এত অদক্ষভাবে ব্যবহার করা ঠিক হচ্ছে না। এর বিকল্প চিন্তা করতে হবে। যেমন ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের রেলস্টেশন, মেট্রোরেলের ছাদ এসব জায়গাকে চার্জিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। আরো বহু সুযোগ রয়েছে, যেগুলো আমাদের দেখতে হবে।