চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ যাতায়াতে অধিকাংশ যাত্রীর প্রথম পছন্দ কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুট। প্রতিদিন সাত-আট হাজার মানুষ যাতায়াত করে কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট দিয়ে। বিআইডব্লিউটিসির সঙ্গে দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে এ নৌরুটের ট্রলার ও স্টিমার সার্ভিস চালু হয় জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে। ছয় বছর ধরেই এটি পরিচালনা করছে জেলা পরিষদ। এরই মধ্যে চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় গত বছর সরকার ফেনী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নৌবন্দর ঘোষণা ও বিআইডব্লিউটিএকে নৌঘাটগুলো পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও তা মানছে না জেলা পরিষদ। সমঝোতা স্মারক নবায়নে আগ্রহী নয় বিআইডব্লিউটিএ। তার পরও নৌরুটটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গড়িমসি করছে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ মার্চ ফেনীর মুহুরী প্রজেক্ট-সংলগ্ন নদী তীরবর্তী অংশ থেকে চট্টগ্রামের ডবল মুরিং থানাধীন রাসমনি ঘাট পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে মীরসরাই-রাসমনি নদীবন্দর ঘোষণা করে সরকার। একই দিন এসআরও নং-৬৩-আইন/২০২০-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ) এ নদীবন্দরের সংরক্ষক নিযুক্ত করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম এ প্রজ্ঞাপন জারি করেন। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে চুক্তি থাকায় এতদিন এ ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি জেলা পরিষদ। গত ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সেটি নবায়নে আগ্রহী নয় বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু এ পরিকল্পনায় রাজি নয় জেলা পরিষদ। দুপক্ষের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তা সুরাহা হয়নি। জটিলতা নিরসনে আগামী ১ মার্চ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের আয়োজন করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নৌ-ঘাটগুলোর পরিচালনা ও ইজারার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। চট্টগ্রামের কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট পরিচালনা নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে যে চুক্তি ছিল, তা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন আমরা ঘাটটি ইজারা দিয়ে পরিচালনা করব। এতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থার যদি কোনো হিস্যা বা আপত্তি থাকে, তবে তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নৌ-ঘাট ইজারা ও পরিচালনা করা হবে।

জানা গেছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা পরিষদের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নবায়ন না করতে অনুরোধ জানায় বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালককে (বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) দেয়া এক চিঠিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি বাতিল ও নতুন করে ঘাটটি ইজারা প্রদানের বিষয়টি জানানো হয়। এরই মধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে একটি সভা অনুষ্ঠিত হলেও জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরা বৈঠক শেষ না করেই চলে যান। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঘাট, পয়েন্টের ইজারা, উন্নয়ন ও পরিচালনার বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ও বিআইডব্লিউটিএর মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি মন্ত্রী পর্যায়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নৌপথের সব ঘাট কিংবা পয়েন্টের উন্নয়ন রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণে রেখে বিরোধপূর্ণ ঘাট কিংবা পয়েন্টের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্ত দেশের বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার বিভাগের সংস্থা প্রতিপালন না করায় ওই বছরের ১৯ নভেম্বর আরো একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় নৌপথের সব ঘাট কিংবা পয়েন্টের উন্নয়ন রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণে থাকার সিদ্ধান্ত হয়। তবে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ ঘাট কিংবা পয়েন্টের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সভার সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হচ্ছে না চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ। ফলে বিরোধপূর্ণ এ ঘাটের ইজারা এবং ২০১৪ সালের ন্যায় নৌ যান চলাচলে অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি প্রজ্ঞাপন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা, সচিব পর্যায়ের বৈঠকে ঘাটটি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া জেলা পরিষদের সঙ্গে গত ছয় বছরের সমঝোতা স্মারকের মেয়াদও শেষ হয়েছে। এরপর উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি নবায়ন করতে পারবে বা চুক্তি ভেঙে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু নির্দেশনা সত্ত্বেও জেলা পরিষদ ঘাটের মালিকানা ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। মূলত সন্দ্বীপের প্রধানতম নৌরুট হওয়ায় এ ঘাটের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বাবদ আয় ছাড়াও বিভিন্নভাবে আয়ের সুযোগ থাকায় জেলা পরিষদ এ ঘাট থেকে নিজেদের কর্তৃত্ব ছাড়তে রাজি নয়।

কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট পরিচালনা ও ইজারার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ সালাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বিরোধপূর্ণ ঘাট নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদকে জানানো হয়নি। চুক্তি শেষ না হওয়ায় এখন পর্যন্ত এ ঘাটের মালিকানা জেলা পরিষদের কাছেই রয়েছে।