ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ হচ্ছে আজ। আর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। এবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পোস্টারের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ থাকছে। ফলে পোস্টারনির্ভর প্রচারণা থেকে সরে এসে প্রার্থীরা ঝুঁকছেন লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানারের দিকে। এসব সামগ্রীর বাড়তি চাহিদায় রাজধানীর ছাপাখানাগুলোতে এখন ব্যস্ততা চরমে, যেখানে রাত-দিন চলছে প্রচারসামগ্রী ছাপার তোড়জোড়। তবে ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে ঢাকার বাইরের ছাপাখানাগুলোয়। অতীতের সংসদ নির্বাচনগুলোয় পোস্টার ছাপানোকে কেন্দ্র করে রমরমা থাকত বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানার ব্যবসা। এবার পোস্টার ছাপানোতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং অনেক প্রার্থী কম খরচের কারণে লিফলেট-ফেস্টুন ঢাকা থেকে ছাপানোয় সেটি হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন উপলক্ষে এরই মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও আপিল শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। আজ প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। আগামীকাল শুরু হবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা।
নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ছাপাখানাগুলোয় ব্যস্ত সময় পার করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেক ব্যবসায়ীকে। গতকাল রাজধানীর মতিঝিল, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, ফকিরাপুল, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী, নীলক্ষেত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলছে নির্বাচনী বিলবোর্ড, ফেস্টুন ও লিফলেট তৈরির কাজ। ফেস্টুন ও বিলবোর্ড তৈরি হচ্ছে আধুনিক ডিজিটাল ছাপাখানায়। আর সনাতনী ছাপাখানায় তৈরি হচ্ছে লিফলেটের কাজ। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ও সনাতনী পদ্ধতির সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গেছে।
ফকিরাপুলের রোজ প্রেস অ্যান্ড প্রিন্টার্সে গিয়ে দেখা যায়, সনাতনী মেশিনে তৈরি হচ্ছে নির্বাচনী লিফলেট। পাশে আধুনিক মেশিনে অন্য প্রিন্টিংয়ের কাজও চলছে। তবে লিফলেট তৈরির কার্যক্রমে কর্মীদের বেশি সক্রিয়তা লক্ষ করা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আব্দুল মালেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসা একেবারে খারাপ নয়। কারণ নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমাদের প্রচুর অর্ডার থাকে, যেগুলো ডেলিভারি দিতে জানুয়ারির মাঝামাঝি হয়ে যায়। এখন নির্বাচনী লিফলেটের কাজ করছি। আবার সামনে রোজা ও ঈদের অর্ডার আসা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা ভালোই চলছে।’
পোস্টার নিষিদ্ধে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা নির্বাচন কেন্দ্র করে হয় না।
নির্বাচনের সময় লাভের অংকটা বেশি হতে পারে, তবে সেটির ওপর আমরা নির্ভরশীল নই। পোস্টারের পরিবর্তে লিফলেটের প্রচুর অর্ডার রয়েছে। সুতরাং আমি মনে করি সেভাবে নেতিবাচক কোনো প্রভাব নেই।’
ফকিরাপুলের পেপসি গলির আকা প্রিন্টার্সে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বিলবোর্ড ও ফেস্টুনের ডিজিটাল পেপার তৈরির কার্যক্রম চলছে। আধুনিক ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে সাদা-কালো নির্বাচনী বিলবোর্ড ও ফেস্টুনের পেপার প্রিন্ট হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কল্লোল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন কাগজের চেয়ে ডিজিটাল পেপারের চাহিদা অনেক বেশি। কাগজ দিয়ে বিলবোর্ড বা ফেস্টুন করা যায় না। ফলে দীর্ঘস্থায়ীত্বের কারণে ডিজিটাল পেপারে প্রার্থীরা বিলবোর্ড ও ফেস্টুন প্রিন্ট করে দিয়ে যাচ্ছেন।’
নিউমার্কেট থানাসংলগ্ন গাউসুল আজম মার্কেট সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে মঙ্গলবার। তবে গ্রাহকের পণ্য ডেলিভারি দেয়ার লক্ষ্যে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান খুলতে বাধ্য হয়েছেন। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানে একজনের বেশি কর্মচারী দেখা যায়নি। মার্কেটের হোসনে আরা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্রেসের স্বত্বাধিকারী আলী আশরাফ গাজী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আজ ভোর পর্যন্ত কাজ করে অর্ডার রেডি করেছি। পণ্য ডেলিভারি দেয়ার জন্য বিকালে দোকান খুলেছি। এবারে আমাদের কাছে শুধু নির্বাচনী লিফলেটের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে আট ইঞ্চি বাই সাড়ে পাঁচ ইঞ্চির চাহিদা বেশি। তবে এর থেকে বড়-ছোট লিফলেটও চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করছি।’
বরিশাল-৫ আসনের বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য গাউসুল আজম মার্কেট থেকে ফেস্টুন তৈরির অর্ডার করা হয়েছে। এ প্রার্থীর নির্বাচনী উইংয়ের সদস্য রায়হান উদ্দিন গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ঢাকা থেকে ফেস্টুন, লিফলেট তৈরি করে বরিশাল নিচ্ছি। কারণ বরিশালের তুলনায় এখানে খরচ অনেক কম। চাহিদা অনুযায়ী ফেস্টুনগুলো সোমবার হস্তান্তরের কথা ছিল, তারা পারেনি। তাই মঙ্গলবার মার্কেট বন্ধের দিন নিতে এসেছি।’
রাজধানীর ছাপাখানাগুলোর তীব্র ব্যস্ততা থাকলেও ঢাকার বাইরের ছাপাখানাগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানাগুলোতে কাজের চাহিদা একেবারে কম। বরিশাল, রংপুর, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে।
রংপুরে মুদ্রণ শিল্পের ব্যস্ততা একেবারে কম। পোস্টার ছাপানোর নিষেধাজ্ঞা সেখানে শুধু হ্যান্ডবিল ছাপানোর কার্যক্রমই চলছে। স্থানীয় মালিক ও শ্রমিকরা জানান, অতীতের সংসদ নির্বাচনগুলোয় পোস্টার ছাপানোকে কেন্দ্র করে আয়-রোজগার ভালোই ছিল। এবারে সেটি হচ্ছে না। রংপুর প্রেসের স্বত্বাধিকারী শাহ বায়েজিদ বলেন, ‘অনেক সময় শ্রমিকদের বেতন তুলতে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিটি নির্বাচনে পোস্টার ছাপিয়ে সেই ঘাটতিটা পূরণ হয় ছাপাখানাগুলোর। কিন্তু এবার তা আর হচ্ছে না।’
যশোরের মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৭৩টি প্রতিষ্ঠান। বিগত তিন নির্বাচনে ব্যবসা না হওয়ায় ত্রয়োদশ নির্বাচনে ব্যবসার আশা তৈরি হয়েছিল ব্যবসায়ীদের। পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞায় হতাশ মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা দাবি করছেন, পোস্টার নিষিদ্ধে যশোরের মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা আনুমানিক ৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। জেলা মুদ্রণ শিল্পের যুগ্ম সম্পাদক আবু ইসহাক বাবু বলেন, ‘পাঁচ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি। কিন্তু পোস্টার ছাপানোয় নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কেননা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের যে ব্যবসা হয়ে থাকে তা দিয়ে পরবর্তী সময়ে আমাদের চলতে হয়।’
যশোর জেলা মুদ্রণ শিল্পের সাধারণ সম্পাদক শাহিনশাহ রানা জানান, জেলায় মোট ৭৩টি ট্রেড লাইসেন্সকৃত প্রেস রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কমপক্ষে চার শতাধিক মানুষ। এবারের নির্বাচনে পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ করায় এসব তাদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। কেননা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে সবচেয়ে বেশি পোস্টার-ব্যানার বানানো হয়ে থাকে।
একই চিত্র বরিশালের মুদ্রণ শিল্পে। বরিশাল নগরীর সদর রোডের নিউ আর্ট প্রেসের মালিক সুলতান তালুকদার বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজের আশায় আগেভাগেই অতিরিক্ত কাগজ কিনে রেখেছিলাম। কিন্তু পোস্টার ছাপানোতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেই কাগজই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে প্রার্থী ও সমর্থকদের ভিড়ে প্রেস পাড়া জমজমাট থাকত। এখন চারদিকে শুধু নীরবতা।’
নগরীর ফকিরবাড়ী রোডের আজমির প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী মো. হেমায়েত হোসেন জানান, বর্তমানে হাতে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ নেই। নির্বাচনী লিফলেটের অর্ডারও আসছে না। বেশির ভাগ প্রার্থী ঢাকা থেকেই কাজ করাচ্ছে বলে শুনছি। তাই এখন ছোটখাটো অর্ডারের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।










