আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে নির্মাণ করা হয় দুটি বিলাসবহুল রিসোর্ট বা অতিথিশালা। নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ইজারার উদ্যোগ নিলেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে অতিথিশালাগুলোর ইজারায় দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করে সংস্থাটি।
সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের অতিথিশালাগুলো আন্তর্জাতিক মানের। এ কারণে বিদেশী বা আন্তর্জাতিক রিসোর্ট পরিচালনায় অভিজ্ঞ কোনো প্রতিষ্ঠানকে ইজারাদার হিসেবে নিযুক্ত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। যদিও অতিথিশালাগুলো ইজারার জন্য আগ্রহী হয়েছে মাত্র দুটি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান। আবার প্রতিষ্ঠান দুটি যে ইজারামূল্য প্রস্তাব করেছে, তা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলনের চেয়েও অনেক কম বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর অতিথিশালাটি নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সার্ভিস এরিয়া-২ প্যাকেজের মাধ্যমে, যার কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। নির্মাণে ব্যয় হয় ২০০ কোটি টাকা। এ অতিথিশালয় বৃত্তাকারের পাঁচটি ক্লাস্টারের প্রতিটিতে রয়েছে ছয়টি করে ডুপ্লেক্স বাড়ি। সব মিলিয়ে ডুপ্লেক্স বাড়ির সংখ্যা ৩০। এসব বাড়ি ছাড়াও অতিথিশালায় রয়েছে একটি দ্বিতল মোটেল মেস। এ মোটেল মেসের প্রতি তলায় রয়েছে ২০টি করে অ্যাপার্টমেন্ট, যেগুলোর প্রতিটির আয়তন ৩০০ বর্গফুট। এর বাইরে রয়েছে একটি অভ্যর্থনা ভবন, যেটিতে প্রশস্ত ডাইনিং হল ও জিমনেসিয়ামের ব্যবস্থা। অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে অফিস ভবন, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল কোর্ট, সুইমিং পুল, মসজিদ, পাম্প হাউজ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, গার্ড হাউজ ও পার্কিং এলাকা।
অন্যদিকে কর্ণফুলী টানেলের অতিথিশালাটি নির্মাণ করা হয়েছে আনোয়ারা প্রান্তে। সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এ অতিথিশালায় রয়েছে একটি ভিআইপি বাংলো। অত্যাধুনিক ও সুজজ্জিত বাংলোটি প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের। বাংলোটিতে রয়েছে ছয়টি কক্ষ। সঙ্গে রয়েছে একটি সুইমিংপুল। এ ভিআইপি বাংলো ছাড়াও অতিথিশালায় রয়েছে আরো ৩০টি বাংলো। রয়েছে ৪৮টি মোটেল মেস। আরো আছে একটি কনভেনশন সেন্টার, রেস্টুরেন্টসহ একটি অভ্যর্থনা ভবন, দোকান, ফুড কোর্ট, জিমনেসিয়াম, কনফারেন্স সুবিধাসহ অফিস স্পেস, বিনোদন এলাকা, অ্যাম্ফিথিয়েটার, জাদুঘর, মসজিদ, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, পানি শোধনাগার, সড়কসহ আনুষঙ্গিক নানা অবকাঠামো। এসব অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

পৃথক দুই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত এ দুই অতিথিশালা ইজারার জন্য গত বছরের জুলাইয়ে প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রথম দরপত্রে পৃথকভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সেতু কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে দুই প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতুর অতিথিশালা ইজারার দরপত্রে অংশ নিয়েছে, সে দুই প্রতিষ্ঠানই আবার কর্ণফুলী টানেলের অতিথিশালা ইজারা নিতে দর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠান দুটি যে দর প্রস্তাব করেছে, তা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলনের তুলনায় কম। এমন প্রেক্ষাপটে পৃথকভাবে দুটি অতিথিশালা ইজারার জন্য দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের রিসোর্টগুলো ইজারার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমরা খুব একটা আগ্রহ দেখছি না। প্রত্যাশিত ইজারামূল্য না পাওয়ার কারণে দুটি রিসোর্ট ইজারার ক্ষেত্রেই আমাদের পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হয়েছে।’
রিসোর্টগুলো আন্তর্জাতিক মানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এগুলো পরিচালনার জন্য বাইরের (আন্তর্জাতিক) কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা এলে সুবিধা হতো।’
বাণিজ্যিকভাবে চালুর পর রিসোর্টগুলো জনপ্রিয় হতে এক-দুই বছর সময় লাগতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আর প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারি না। যারা ইজারাদার হিসেবে দায়িত্ব নেবে, তারাই কাজটি করবে। ইজারার পর পরিচালনা শুরু হলে তখন বোঝা যাবে আসলে এগুলোর চাহিদা কেমন। আমরা ধারণা করছি, এগুলো রান করাতে এক-দুই বছর সময় লাগবে।’










