লক্ষ্মীপুরে দিনরাত শ্রমিক দিয়ে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। আর এ মাটি পিকআপ ভ্যান ও ট্রাকে করে সরবরাহ হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের (৩নং ওয়ার্ড) মাইচ্ছার মাঠ নামক স্থানে কৃষকের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে প্রতিদিন এ অবৈধ কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমির মালিকদের বিভিন্ন প্রলোভনে ফাঁদে ফেলে মাটি কেটে নিচ্ছেন তারা। এতে নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বর্গাদার কৃষক। অন্যদিকে ট্রাকে করে মাটি নেয়ায় নষ্ট হচ্ছে সড়ক, ধূলিবালিতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

অবৈধভাবে ফসলি জমি থেকে ইটভাটায় মাটি সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকায় গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নয়জনকে আটক করেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মখবুল হোসেন। তাত্ক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আটককৃতদের অর্থদণ্ড এবং ফসলি জমির মাটি না কাটার শর্তে মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়, কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল হোতারা। তবে প্রশাসনের এ অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরের দিন সকাল থেকে পুনরায় শুরু করা হয় একই স্থান থেকে ফসলি জমির মাটি থেকে ইটভাটায় সরবরাহ কার্যক্রম।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি কার্যক্রমের মূল পরিচালনায় রয়েছেন ১২-১৩ জন স্থানীয় প্রভাবশালী। তারা হলেন বাংগাখাঁ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শেখ জামান স্বপন ও তার সহযোগী মো. ফারুক।  এছাড়া রয়েছেন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রুবেল ও তার ভাই রবিন, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহাগ ও তার সহযোগী রহিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিহাদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফরহাদুল ইসলাম ওরফে সৈনিক ফরহাদ, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বাসার, আদিলপুর এলাকার ফরহাদ, আলমগীর হোসেন, ইউসুফ, শিপন, কিরণ, শওকত, সুমন, রাপু ও ইউপি সদস্য শাহজাহান। স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালীরা প্রথমে কিছু ফসলি জমির মালিকদের প্রলোভন দিয়ে মাটি কিনে নিয়ে যান। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আশপাশের জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে নিজেদের মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরেজমিনে বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের মাইচ্ছার মাঠ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশে একটি মাঠেই প্রায় ১৩৫ কানি ফসলি জমির মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। শ্রমিক দিয়ে এসব জমি থেকে মাটি কেটে একের পর এক পিকআপ ও ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। দূর থেকে মনে হবে ফসলি মাঠে পিকআপ ভ্যান ও ট্রাকের বিশাল মেলা বসেছে। রাতেও এ মাঠে আলো জালিয়ে চলে মাটি কাটা ও ইটভাটায় সরবরাহের কাজ।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, মাইচ্ছার মাঠের ১৩৫ কানি ফসলি জমির মধ্যে স্থানীয় হারুনুর রশিদের ৯ শতাংশ জমির মাটি, বকুল কাজীর ৩০, আনার উল্যার ৪২, হাফিজ উল্যার ৪২, আলমগীর কাজীর ৬০ ও মো. হেলালের ১৮ শতাংশ ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করছেন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিহাদ। স্থানীয় মুড়ি ব্যবসায়ীর ৩৩ ও আবুল কাশেমের ৩০ শতাংশ জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করেছেন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সোহাগ ও তার সহযোগী রহিম, স্থানীয় নুরুল আমিনের মালিকাধীন ৬৬ শতাংশ জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফরহাদুল ইসলাম ওরফে সৈনিক ফরহাদ।             

স্থানীয় শামছুল ইসলাম, নুরুল আলমসহ কৃষকরা জানান, মাইচ্ছার মাঠের ফসলি জমির মালিকদের মধ্যে অনেকেই কৃষককে দিয়ে বর্গা চাষাবাদ করে থাকেন। তাই টাকার লোভে তারা জমির টপ সয়েল বিক্রি করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে পাশের জমি নিচু হওয়ায় সেচের পানি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে নিজের জমির মাটিও বিক্রি করছেন অনেকে। এতে সর্বনিম্ন ছয় শতাংশ জমি থেকে কোদালের দুই কোপ পরিমাণ মাটি বাবদ ৩০-৩২ হাজার টাকা পাচ্ছেন জমির মালিকরা। এতে জমির মালিকরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বর্গাচাষীরা। অন্যদিকে জমির টপ সয়েল কেটে নেয়ায় কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন।

আরেক কৃষক নুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার পাঁচ গণ্ডা জমির চারপাশের জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এতে আমার জমি উঁচু হয়ে পড়ায় সেচ দিতে পারছি না। বাধ্য হয়ে নিজে মেশিন বসিয়ে ফসলি জমিতে পানি দিতে হচ্ছে। এতে আমার অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। যেখানে সেচের পানি ২০০-৩০০ টাকায় পেতাম। এখন তার খরচ পড়ছে ৮০০-১০০০ টাকা।’

ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শেখ জামান স্বপন, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিহাদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযুক্ত মাটিবিক্রেতা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক রুবেল মাটি বিক্রির বিষয় স্বীকার করে বলেন, ‘আমি মাত্র তিনটি স্পট থেকে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করি। আমার থেকে আরো ৮/১০ জন প্রভাবশালী আছেন। তারা বিভিন্ন স্পট থেকে মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে আসছেন। তাদের বন্ধ করেন, তাহলে আমিও বন্ধ করে দেব।’ অভিযোগ অস্বীকার করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফরহাদুল ইসলাম সৈনিক ফরহাদ বলেন, ‘আমার চারটি পিকআপ ভ্যান আছে। মাটিবিক্রেতাদের কাছে ভাড়া দিয়েছি। আমি মাটি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত নই।’

জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপপরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘ফসলি জমির উপরিভাগের যে মাটি (টপ সয়েল) ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। এটা কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই ক্ষতিকর। জমির এ টপ সয়েল তৈরি হতে ২০-৫০ বছর সময় লেগে যায়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কৃষককে সচেতন করা হচ্ছে।’ তিনি ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা বন্ধে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ বলেন, ‘যেখানে সরকার ইঞ্চি পরিমাণ জমি অনাবাদি রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে সেখানে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এ ঘটনায় নয় জনকে জরিমানা করা হয়েছে। মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’