মা-ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত বৃহস্পতিবার সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। কিন্তু জাল ফেলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূল থেকে চাঁদপুর, পিরোজপুর, বরগুনা ও বরিশালের নদ-নদী—সবখানেই কম মাছ পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন জেলেরা। বড় ট্রলারগুলোও এখনো ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরেনি। অথচ এ সময় রাজধানীর বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে সরবরাহ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে নিষেধাজ্ঞার আগের হিমায়িত মাছ এবং কক্সবাজার দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ। এসব মাছের একটি অংশ আবার পদ্মা-মেঘনা কিংবা চাঁদপুর-বরিশালের ইলিশ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে উৎস সম্পর্কে না জেনে বেশি দাম দিয়ে মাছ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।

কক্সবাজারের স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের ইলিশের বড় একটি অংশ বঙ্গোপসাগরেই হাতবদল হচ্ছে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী সাগরে মিয়ানমারের জলসীমার কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে জেলেদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ইলিশ কিনছেন। পরে নৌযানে করে এসব মাছ নিয়ে আসা হচ্ছে কক্সবাজার ফিশারীঘাটে। কখনো স্থানীয় জেলেদের মাধ্যমেও মাছের হাতবদল হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে বৈধ পথে ইলিশ আমদানির অনুমতি না থাকলেও এভাবে মাছ আসার বিষয়টি স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের মাছ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইলিশের ব্যবসা এখন অনেকটাই সাগরকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। কক্সবাজার ও টেকনাফের অনেক ব্যবসায়ী বঙ্গোপসাগর ও মিয়ানমার জলসীমার কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে কম দামে ইলিশ কেনেন। পরে সেগুলো কক্সবাজার ফিশারীঘাটে এনে বিক্রি করেন। এসব কেনাবেচার বড় একটি অংশ সাগরেই হয়।’

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের জলসীমার কাছাকাছি এলাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায় কেনেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজার ফিশারীঘাটে পৌঁছার পর সেটির পাইকারি দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। চাহিদা বাড়লে তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়ও বিক্রি হয়। পরে এসব মাছ সরবরাহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

ইলিশের স্বাদ, ঘ্রাণ ও বাজারমূল্যের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ইলিশ গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা-মেঘনা ও চাঁদপুর-বরিশাল অঞ্চলের নদীর ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণ তুলনামূলক বেশি। এ কারণে এসব মাছের চাহিদা ও দামও বেশি থাকে। অন্যদিকে কক্সবাজার উপকূল ও মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ফলে এগুলোর বাজারমূল্য তুলনামূলক কম। তাই রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কক্সবাজার ও মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশকে চাঁদপুর কিংবা পদ্মা-মেঘনার মাছ বলে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। মাছের উৎস ও বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে না পারায় ক্রেতাদের অনেকেই বেশি দাম দিয়েও প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরেও এমন চিত্র দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারে গতকাল এক কেজি থেকে ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এর চেয়ে বড় মাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩ হাজার টাকার আশপাশে।

কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. কাওছার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাঁদপুর-বরিশাল এলাকার ইলিশের তুলনায় কক্সবাজার ও মিয়ানমারের মাছ কিছুটা লম্বা আকৃতির হয়। স্বাদ ও ঘ্রাণের পার্থক্যের কারণে এসব মাছের চাহিদা ও দামও কম। তবে অনেক ক্রেতা মাছের উৎস ও বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম দামের মাছকে চাঁদপুর বা বরিশালের ইলিশ বলে বেশি দামে বিক্রি করেন।’

এ ব্যবসায়ী জানান, তার দোকানে এক কেজি থেকে ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের চাঁদপুরের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। বরিশাল অঞ্চলের একই ওজনের মাছের দাম ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা শেষে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে নেমেও হতাশ জেলেরা। গত বৃহস্পতিবার ইলিশ আহরণ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়েনি। কুয়াকাটা উপকূলের জেলেরা বলছেন, আগের মতো ইলিশ জালে পড়ছে না।

কুয়াকাটার স্থানীয় জেলে আব্দুর রহিম বলেন, ‘আগে সৈকতের কাছেই খুঁটা জাল ফেললে বড় বড় ইলিশ মিলত। এখন আর উপকূলের কাছাকাছি কোনো ইলিশ পাওয়া যায় না।’

মাছ কম পাওয়ার পেছনে অবৈধভাবে মাছ শিকার ও ট্রলারের দাপটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও। মহিপুরের গাজী ফিশের স্বত্বাধিকারী মো. মজনু গাজী বলেন, ‘সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে মাছের বংশবৃদ্ধি ঘটলেও অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো মাছ ধরার চেয়ে নষ্ট করে বেশি। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।’

চাঁদপুরের জেলেদের অবস্থাও একই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও প্রত্যাশিত ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। অনেকের ক্ষেত্রে নৌকার জ্বালানি খরচও উঠছে না।

ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে বাড়ার পর কয়েক বছর ধরে দেশে ইলিশ আহরণ কমতে শুরু করেছে। বিরূপ আবহাওয়ার পাশাপাশি সরকারি বিধিনিষেধ প্রতিপালনে মৎস্যজীবীদের অনীহাও এর অন্যতম কারণ।’

তিনি আরো বলেন, ‘মা-ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে বৈধ সময়ে আহরণ করা মাছের মজুদ সম্পর্কে প্রশাসনকে তথ্য জানানোর কথা ছিল। কিন্তু দেশের প্রধান ইলিশ আহরণকারী বিভাগ চট্টগ্রামে কোনো জেলে বা ব্যবসায়ী এ বিষয়ে তথ্য দেননি। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার আগে আহরণ করা মাছের মজুদ ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। মৎস্য বিভাগের জনবল কম থাকায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের এসব প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মুখে।’

এদিকে নদী ও সাগরে ইলিশের সংকট থাকলেও রাজধানীর বাজারে সরবরাহ বাড়ার পেছনে রয়েছে নিষেধাজ্ঞার আগে কিংবা নিষেধাজ্ঞার সময় আহরণ করা হিমায়িত মাছ। এসব মাছ এখন বাজারে তোলা হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

হিমায়িত ইলিশ চেনার বিষয়ে কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. কাওছার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা মাছের গায়ের রঙ কিছুটা ধূসর হয়ে যায়। টাটকা মাছের রঙ তুলনামূলক চকচকে সাদা থাকে। তাছাড়া দীর্ঘদিন বরফে সংরক্ষণ করা মাছ ধরলে বেশি শক্ত মনে হয়। অন্যদিকে টাটকা কিংবা পাঁচ-সাতদিন আগে ধরা মাছ তুলনামূলক নরম থাকে।’

প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাধারণত বাজারে ইলিশ সরবরাহ বাড়ে। ফলে এ সময়ে দাম কিছুটা কমার প্রত্যাশা থাকে। তবে চলতি বছর সে চিত্র দেখা যাচ্ছে না। মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ইলিশের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আহরণ অঞ্চলভেদে বড় আকারের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকায়।

অন্য উৎসের ইলিশকে চাঁদপুর বা পদ্মা-মেঘনার মাছ বলে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অবস্থান জানতে চাওয়া হয় সংস্থাটির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলামের কাছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অন্য অঞ্চলের ইলিশকে চাঁদপুরের মাছ বলে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ ধরনের প্রতারণা এড়াতে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে।’

বেশি দামে বিক্রির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশে ইলিশের নির্ধারিত দাম নেই। এটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার হওয়ায় বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ সীমিত। তবে কোনো মাছ বিক্রির অনুপযোগী হলে কিংবা পচে গিয়ে গুণগত মান নষ্ট হলে ব্যবস্থা নেয় অধিদপ্তর।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিস; কক্সবাজার, চাঁদপুর ও পটুয়াখালী প্রতিনিধি)