স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশ কোনো দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়। বরং পুলিশ হবে জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত করে এ বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিবান্ধব ও মানবিক সংস্থায় রূপান্তর করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

আজ রোববার সকালে রাজশাহীর সারদা পুলিশ অ্যাকাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের (প্রথম পর্যায়) সমাপনী কুচকাওয়াজ-২০২৬ অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চরম দলীয়করণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুনর্গঠনে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। বাহিনীর পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনতে সততা ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে পুরস্কার ও তিরস্কারের নীতি কঠোরভাবে চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের জন্য যেমন পুরস্কৃত করা হচ্ছে, তেমনি অপরাধ বা শৃঙ্খলাভঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আজকের আনন্দঘন মুহূর্তটি তাদের জীবনে অনেক আগেই আসার কথা ছিল। বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত যে সীমাহীন বঞ্চনা ও অমানবিক যন্ত্রণা তারা সহ্য করেছেন, তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ন্যায্য অধিকার ও পদমর্যাদা ফিরে পাওয়ায় তিনি সব কর্মকর্তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

নবীন এএসপি প্রবেশনারদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, আপনারা দেশের এক ঐতিহাসিক রূপান্তরকালে পেশাগত জীবনে পদার্পণ করছেন। তিনি বলেন, আইনের চোখে রাজপথের কর্মী থেকে প্রান্তিক কৃষক—সবাই সমান। সেবা নিতে এসে কেউ যেন কোনো প্রকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, চেইন অব কমান্ড, শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও সমন্বিত নেতৃত্বই বাহিনীর মূল শক্তি।

মন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ তদন্তে নবীন কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তাই সব পুলিশ সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচ ১ম পর্যায়ের সদস্যরা তাঁদের দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন পেশায় অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনপ্রত্যাশা ও জনআকাঙ্ক্ষা অনুয়ায়ী দায়িত্ব পালনে নবীন এএসপি প্রবেশনারদের প্রতি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দেশী-বিদেশী আমন্ত্রিত অতিথি, এএসপি প্রবেশনারদের অভিভাবক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন করেন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মধ্য হতে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

‎প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ ‎সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া। তিনি দীর্ঘ প্রশিক্ষণের কৃতিত্বের অংশ হিসেবে বেস্ট ‎প্রবেশনার এবং বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড- এই দুই ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার গৌরব অর্জন ‎করেন। এছাড়াও বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান ‎মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ এ বি এম মামুন।

পরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আশুলিয়া ও মতিঝিলে বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), ডিএমপি'র বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল বস্তুগুলো নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করেছে।

সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী আরো জানান, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি জানান, তুলনামূলক বিচারে দেশে অপরাধ প্রবণতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের হার বর্তমানে অত্যন্ত কম। সরকার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।