এ তিনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের পরিবর্তে চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন কিংবা রোগী ও রোগীর স্বজনরা যদি চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস এবং মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে আমরা যতই হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।’

গতকাল সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল’-এর নবনির্মিত ১৫ তলা ‘ভবন-২’-এর (নিউরোসায়েন্স-২) উদ্বোধন ও ফলক উন্মোচন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে চাই, ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২-এর উদ্বোধনের মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আরো এক ধাপ এগিয়েছি।’

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আজ যেই হাসপাতালটির নতুন ভবনের উদ্বোধন হলো, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর এ হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সময়ের প্রয়োজনে আরো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এ হাসপাতাল আকার আয়তনে আরো বড় রূপ ধারণ করল।’

আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রযুক্তি ও মানবিকতার সংমিশ্রণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।’

চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই। সহানুভূতিশীল আচরণ, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝা চিকিৎসার মানকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার দায়দায়িত্ব চিকিৎসকের একক নয়, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।’

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসা কেবল শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায় না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগী যাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে না এসেও চিকিৎসা পান, সেজন্য ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ ‘‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’’ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।’

আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্থ আগামী বিনির্মাণের লক্ষ্যে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া আমাদের সবার দায়িত্ব এবং কর্তব্য। সেদিকে লক্ষ্য রেখে বর্তমান সরকার শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করছে। একইভাবে শিশু স্বাস্থ্যের প্রতিও সরকার বিশেষভাবে নজর দিয়েছে।’

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ‘‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’’ গড়ার অঙ্গীকার স্রেফ কোনো স্লোগান নয়। সরকার একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে না হয় এবং অর্থাভাবে কেউ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। স্ট্রোক, এপিলেপসি, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া ও মেরুদণ্ডের জটিল রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা নিউরোসায়েন্সে হাসপাতালের এ নতুন ভবনের মাধ্যমে বহু গুণ বাড়বে। সর্বাধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও ডায়াগনস্টিক সুবিধাসংবলিত এ ভবনটি সেবার পাশাপাশি চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’

সরকার এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না। কিংবা কেউ অর্থাভাবে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না। একজন সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রদান আপনাদের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। এ সময় সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিত এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।