মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধি ও সম্প্রতি ঘোষিত পে-স্কেলের কারণে অপরিবর্তিত নীতি সুদহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশই থাকছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ছয় মাসের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। এ সময় অন্য ডেপুটি গভর্নর সারোয়ার হোসেন ও আনিছুর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গত দুই মাস মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিম্নমুখী থাকলেও আগামী দিনগুলোতে এ অবস্থান অব্যাহত থাকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি গত জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের বেশি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি ও হরমুজ প্রণালি সংকট এবং সম্প্রতি সরকারের ঘোষিত পে-স্কেলের কারণে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার না কমিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মুদ্রানীতি কমিটির সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সংকটের সময় ধার নেয়ার মাধ্যম “স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)” হার ১১ শতাংশ এবং “স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)” হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো থেকে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।’
দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুনে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল সর্বনিম্ন রেকর্ড। এ পরিস্থিতিতে ঋণের খরচ কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরও ঋণ প্রবৃদ্ধি খুব একটা বাড়েনি। ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কম থাকায় সেই অর্থের বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে গতকাল প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। তবে আশার কথা হলো, রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার হার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালু, কৃষি, সিএমএসএমই ও রফতানি খাতের প্রসারে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজ বাস্তবায়নে নতুন করে কিছু উদ্যোগ নেয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি বজায় রাখা। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রেখে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট খাতে ঋণসহায়তা প্রদান, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক রাখা, বৈদেশিক খাতে ভারসাম্য সৃষ্টি এবং আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করা।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে বলা হয়, বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যেখানে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর অর্থ হলো, বার্ষিক প্রবৃদ্ধির এ প্রাক্কলন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অন্তর্নিহিত চাপকে পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও করতে পারে। উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাহিদা ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধির গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।










