আট কিলোমিটার বোয়ালখালী-রাঙ্গুনিয়া সংযোগ সড়ক নির্মাণে বিক্ষিপ্তভাবে কাটা হয়েছে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক পাহাড়। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ করলেও পাহাড়ি ঢল এবং মাটি ধসের কারণে বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে, এমনকি ভেঙে পড়ছে সড়কটির অনেক স্থানে। নিয়মিত মাটি ধসের কারণে নির্মিত সড়কটি কয়েক দফায় সংস্কারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় প্রকল্পের ৩০ শতাংশ বাকি রেখেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান!

এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটি নির্মাণে পাহাড় কাটার বিষয়ে অনুমতি নিয়ে অস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে এলজিইডি। তারা বলছে, প্রকল্পের শুরুতে সড়কটি নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটার অনুমতি মৌখিকভাবে নেয়া হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটার অনুমোদন নেয়নি আর প্রকল্পটি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্যও নেই।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যমতে, ‘ক্লাইমেট রেসিলেন্ট রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন ফ্লাস ফ্লাড এরিয়া অব চিটাগং ডিস্ট্রিক্ট রাঙ্গুনিয়া অ্যান্ড বোয়ালখালী উপজেলা’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেয় একনেক। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরটিআইপি-২ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকার এ সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

সড়কটির দৈর্ঘ্যে ধরা হয় ৭ দশমিক ৫৮৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২৪ ফুট। তবে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ সংযোগ সড়কের জন্য বোয়ালখালী উপজেলার কালুরঘাট-শ্রীপুর খরণদ্বীপ-ভাণ্ডালজুড়ি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ও রাঙ্গুনিয়ার গুদামঘর থেকে পূর্বমুখী ২০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০০৭ সালে কালুরঘাট থেকে ভাণ্ডালজুড়ি হয়ে গুদামঘর পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ ও পুনরায় মেরামত করা হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে জাপান ব্যাংক ন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) অর্থায়নে সড়কের উন্নয়ন করা হয়েছিল।

সরেজমিন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠপুরা ও খরণদ্বীপ থেকে রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা গুদামঘর পর্যন্ত ৭ দশমিক ৫৮৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজে প্রায় ৪৫টি ছোট-বড় পাহাড় কাটা হয়েছে। সরেজমিন বোয়ালখালী হয়ে রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়কে গিয়ে দেখা যায়, কর্তনকৃত পাহাড়গুলো চট্টগ্রামের আলোচিত বায়োজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণে সিডিএ যেভাবে ৯০ ডিগ্রি খাড়া অ্যাঙ্গেলে কাটা হয়েছে সেভাবেই কাটা হয়েছে বেশির ভাগ পাহাড়। এমনকি রাঙ্গুনিয়া অংশের দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়েই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ করা হলেও সড়কের পাশে ছড়া এবং খাল থাকার কারণে সড়কটির বেশির ভাগই স্থানে ফাটল ধরেছে। এমনকি ভেঙে পড়েছে কয়েকটি স্থানের সড়ক। এদিকে সড়কটি উঁচু-নিচু হওয়ায় শীতের মৌসুমেও বেশ কয়েকটি স্থানে অন্তত এক-দেড় ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা বর্ষা মৌসুমে তিন ফুট পর্যন্ত ডুবে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। অন্যদিকে রাস্তায় ভাঙন শুরু হওয়ার কারণে জায়গায় জায়গায় সড়কটিতে আরসিসি ঢালায় দেয়া হয়েছে। যেগুলো ছিল নিম্নমানের। এদিকে খাড়াভাবে পাহাড় কাটার কারণে এখন পাহাড়গুলো সড়কের ওপরই ভেঙে পড়ছে। এদিকে সড়কের একপাশে ভেঙে যাওয়ার কারণে নতুন করে সড়কটি পুনর্নির্মাণ করতে হলে কাটা পাহাড় আবারো কাটতে হবে। এছাড়া সড়কের বেশির ভাগ অংশের কার্পেটিং উঠে গেছে।

সড়কটি পাহাড়ের মাঝে এবং পাদদেশে নির্মাণ করার কারণে ৩১টি সেতু এবং কালভার্ট নির্মাণ করার কথা থাকলেও এখনো সবগুলো নির্মাণ করা হয়নি। তবে এ কালভার্ট এবং সেতুসংলগ্ন মাটি ধসে যাওয়ায় এ সেতুগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে, বোয়ালখালী উপজেলার ৮ নং শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোকাররম বণিক বার্তাকে জানান, নতুন এ সড়ক নির্মাণের আগেই এখানে ছোট পরিসরে রাস্তা ছিল। নতুন করে পাহাড় কাটা হয়নি। আরো আগে এসব পাহাড় কাটা হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত পাহাড়ি ঢল এবং প্রাকৃতিক ছড়ার পাশে সড়কটি নির্মাণ হওয়ায় মাটি ধসে পড়ার কারণে সড়কটি নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, এ পাহাড়ি রাস্তায় যে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, সেটা মূলত পাহাড় কেটেই করা হয়েছে। আগে এখানে রাস্তা ছিল, তবে সেটা খুবই ছোট পরিসরে। তাছাড়া এ সড়ক দিয়ে রাতে এবং সকালে বুনোহাতি চলাচল করে। তবে এখানকার মাটি খুবই নরম হওয়ার কারণে সড়ক নির্মাণ করা গেলেও সেটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যে সেতুগুলো সড়কের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, অতিরিক্ত পাহাড়ি ঢলে সেই সেতুগুলোর মাটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (জেলা) জমির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি এক বছর। এলজিইডির প্রকল্পটিতে পাহাড় কাটা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। তারা কোনো অনুমোদন নিয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমি কোনো তথ্য পাইনি।

তবে একই প্রসঙ্গে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) সৈয়দ নজমূল আহসান বণিক বার্তাকে জানান, এলজিইডি প্রকল্পগুলো পরিবেশের জন্য লাল তালিকাভুক্ত। চট্টগ্রামে বোয়ালখালী থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত পাহাড় কেটে যে সড়ক নির্মাণের কথা আপনারা জানালেন, সে বিষয়ে এলজিইডি আমাদের কাছে কোনো অনুমোদন নেয়নি। এমনকি প্রকল্প সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে পাহাড় কাটার কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াহিদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, সড়কটি নির্মাণের জন্য চুক্তি হয়েছিল, তখন পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের সঙ্গে হয়তো মৌখিক কোনো চুক্তি হয়েছিল পাহাড় কাটার ব্যাপারে। নতুন করে প্রকল্পের কোনো পাহাড় কাটা হয়নি।