শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটাকে আরো ৫৬৭ মিলিয়ন বা প্রায় ৫৭ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার দেয়া এ রায় শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে মেটার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক দণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

নিউ মেক্সিকোর বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড বলেন, শিশুদের জন্য মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর 'পাবলিক নিউসেন্স' বা জনদুর্ভোগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি মেটাকে এমন একটি তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন, যার অর্থ ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে ব্যয় করা হবে।

এ মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে আগেও ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এবারের জরিমানাসহ মোট আর্থিক দণ্ডের পরিমাণ দাঁড়াল ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।

রায়ে বিচারক মেটার সঙ্গে একটি কারখানার তুলনা করেন। তিনি বলেন, কারখানা যেমন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দূষণও সৃষ্টি করে, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন ও কনটেন্টের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণের ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে, যা দূর করা জরুরি।

ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং থ্রেডসের মতো প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মেটা। প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করবে।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছি। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা সবসময় স্বচ্ছ থেকেছি। কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রমের ওপর আমরা আস্থাশীল এবং তথ্য বিকৃত করে আনা অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।

শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগে প্রেক্ষিতে মেটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি হচ্ছে মেটা। নিউ মেক্সিকোর রায় ছাড়াও চলতি বছরের শুরুর দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে একই ধরনের একটি মামলায় হেরেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

নিউ মেক্সিকোয় ২০২৩ সালে হওয়া মামলাটি করেছিলেন ওই রাজ্যের কয়েকজন আইনজীবী। এতে অভিযোগ করা হয়, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে শিশুদের বিপদে ফেলেছে এবং তাদের যৌন উত্তেজক উপাদান ও যৌন নিপীড়কদের সংস্পর্শে এনেছে, তার জন্য মেটাকে দায়বদ্ধ করা উচিৎ।

বিচারের প্রথম ধাপে দেখা গিয়েছিল, মেটা বারবার নিউ মেক্সিকোর আনফেয়ার প্রাকটিসেস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। সেখানে দেখানো হয়, মেটার সুপারিশমূলক অ্যালগরিদমগুলো মূলত কম বয়সী ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কন্টেন্ট এবং যোগাযোগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মামলার দ্বিতীয় ধাপের রায় দিতে গিয়ে বিচারক বিয়েডশেইড দেখেছেন, মেটার ক্ষতি 'জনদুর্ভোগ' বা একটি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সমস্যায় পৌঁছেছে। এটি এতটাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে তা সাধারণ জনগণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিচারক লিখেছেন, কারখানার দূষণ যেমন শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাবও অনলাইন জগৎ পেরিয়ে বাস্তব জীবনে শিশু, তাদের পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বিচারক বিয়েডশেইড বলেছেন, মেটাকে যে তহবিল তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা ক্ষতির ভবিষ্যৎ প্রভাব কমানোর জন্য অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।

আদেশের তথ্য অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ দিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার শিশুদের ইতোমধ্যে হওয়া ক্ষতির চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আচরণগত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে।

এছাড়া শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমেও এ তহবিলের অর্থ ব্যয় হবে।

মেটাকে আরো কিছু ব্যবস্থা কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। যার মধ্যে রয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের কোনো অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে সুপারিশ করা যাবে না তা নিশ্চিত করা, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে মেসেজ পাঠাতে পারবে না, অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের নগ্নতা পাঠানো বা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করা এবং যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য ১-স্ট্রাইক নীতি কার্যকর করা।

এগুলোর বাইরেও মেটাকে আরো কিছু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমনপ্রতিদিন রাত দশটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য 'লাইক' কাউন্ট বা সংখ্যা তুলে নেয়া। স্কুলের ছুটির দিন বাদে সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত এই ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য পুশ নোটিফিকেশন নিষিদ্ধ করা। এছাড়া প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা বা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করছেন- এমন ব্যবহারকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক 'ব্যবহার সীমা' নির্ধারণ করা।

আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় বিচারকার্য শুরু হতে চলেছে। শিশু গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় তিন ডজন আইনজীবী কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করছেন।